হিলরিপোর্ট ডেস্ক

খাগড়াছড়ি:আবারও অন্তবর্তী পরিষদ গঠন করা হচ্ছে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ (খাপাজেপ)-এ। এই নিয়ে সপ্তম বারের মতো অনির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্ব গ্রহণের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। বিষয়টিকে হতাশাজনক উল্লেখ করে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জনপ্রতিনিধি দিয়ে জেলা পরিষদ পুর্নগঠনের দাবি জানিয়েছে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৯ সালে প্রথমবারের মতো নির্বাচন হয়েছিল। চাকমা সম্প্রদায়ের সমীরণ দেওয়ানের নেতৃত্বে ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ নির্বাচিত পরিষদ ৫ বছর কাজ করেছে। কিন্তু ১৯৯৪ সালে প্রথম নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ শেষে সরকার সাবেক জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরার নেতৃত্বে ৫ সদস্য বিশিষ্ট অন্তবর্তীকালীন, পরে জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি মনীন্দ্র লাল ত্রিপুরার নেতৃত্বে দ্বিতীয়, সাবেক জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি রুইথী কার্বারীর নেতৃত্বে তৃতীয়, বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার নেতৃত্বে চতুর্থ, জেলা আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি চাইথোয়াই মার্মার নেতৃত্বে পঞ্চম পরিষদ গঠন হয়। বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি কংজরী চৌধুরীর নেতৃত্বে ষষ্ঠ অন্তবর্তীকালীন পরিষদ দিয়ে চলছে এই পরিষদ।। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন-১৯৮৯ এর ১৬ ধারায় নির্বাচিত পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি।

দলীয় নেতা ও কর্মীদের সূত্রে জানা যায়, গত ডিসেম্বর থেকেই সপ্তম খাপাজেপ অন্তবর্তীকালীন পরিষদে ঠাঁই পেতে তদবির শুরু করেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতারা। স্থানীয় জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি অনেকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের আশীর্বাদ পেতে চেষ্টা করছেন। খাপাজেপ চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নের জন্য এগিয়ে আছেন তরুণ রাজনীতিবিদ মংসুইপ্রু চৌধুরী অপু। স্থানীয় সংসদ সদস্যের আস্থাভাজন এই নেতা ছাত্রজীবন থেকে উপজেলা ছাত্রলীগ, পরে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি, যুবলীগের সভাপতি ও বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের প্রথম যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আলোচনায় রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রণ বিক্রম ত্রিপুরা, সিনিয়র সহ-সভাপতি ও বর্তমান চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী এবং সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সাবেক খাপাজেপ চেয়ারম্যান চাইথোঅং মারমা।

১৪ সদস্য পদের জন্য বাঙালিদের থেকে চেষ্টায় রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্মলেন্দু চৌধুরী, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায়, মানিকছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবদুল জব্বার, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মো. মাইনুদ্দিন, মাটিরাঙা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মো. শামছুল হক, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহানাজ আক্তার, নিগার সুলতানা ও ফারজানা আজম।

চাকমা সম্প্রদায় থেকে রয়েছেন অ্যাডভোকেট আশুতোষ চাকমা, প্রভাষক নীলোৎপল খীসা, শতরূপা চাকমা, জুয়েল চাকমা ও সুদর্শী চাকমা। মারমা সম্প্রদায় থেকে মাগ্র মারমা, ক্যাজরী মগ, ম্যামং মারমা, বাঁশরী মারমা, সুইচিংথুই মারমা। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের পার্থ ত্রিপুরা জুয়েল, খোকনেশ্বর ত্রিপুরা, সনজিত ত্রিপুরা, খগেশ্বর ত্রিপুরা ও হিরণজয় ত্রিপুরা জোর তদবির চালাচ্ছেন।

এছাড়া আরো অনেকে কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগ নেতাদের মাধ্যমে খাপাজেপে স্থান পাবার জন্য জোর লবিং চালাচ্ছে। চলমান মৌসুমে টনে-টনে আম, কাঁঠাল, লিঁচু ও আনারসসহ নানা উপটৌকন পাঠানো হচ্ছে।

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘পাহাড়ে সরকারের ৩২টি বিভাগ সরাসরি পরিচালনাকারী এবং বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়োগদানকারী কর্তৃপক্ষ হচ্ছে খাপাজেপ। অনির্বাচিত তথা অন্তবর্তীকালীন পরিষদ দিয়ে চলা খাপাজেপের প্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি না থাকায় দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে সংস্থাটি।

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি সুদর্শন দত্ত বলেন, ‘বর্তমানে সরকার যে সপ্তম বারের মতো অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠনের চিন্তা করছে, তা দ্রুত পরিবর্তন করে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি এলে উন্নয়ন কাজ ভালো হবে।’

খাগড়াছড়ি আসনের সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, ‘নানা কারণে নির্বাচন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই সরকার অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ পুনর্গঠনের চিন্তা করছে। ইতোমধ্যে দল থেকে এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে নামের তালিকা পাঠানো হয়েছে।’

পার্বত্য চট্রগ্রাম জন সংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, ‘নানা জটিলতায় গত আড়াই দশকে নির্বাচন হয়নি। ফলে বিভিন্ন সরকারের আমলে মনোনীত সদস্যের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছিল পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকার ইতোমধ্যে ৩০-৩২টি সরকারি বিভাগ জেলা পরিষদের হাতে ন্যাস্ত করেছে। কিন্তু অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ থাকায় বিভাগগুলোতে পর্যাপ্ত তদারকি হয় না। এসব স্থবিরতা দূর করতে আমরা পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোতে নির্বাচনের দাবি করছি।’

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমএন আবছার বলেন, ‘খাপাজেপ সরকারি দলের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন সেন্টারে পরিণত হয়েছে। জনগনের সেবা ও উন্নয়নের নামে খাপাজেপ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়করণ ও লুটপাটের সেন্টারে পরিণত হয়েছে।’

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী জানান, তিনি সব সময়ই নির্বাচনের পক্ষে। নির্বাচন হলে খাপাজেপ আরও বেশি সক্রিয় হবে। ফ্যাক্সের মাধ্যমে নিয়োগ পত্র আসবে না বা ফ্যাক্সের মাধ্যমে অপসারণ প্রক্রিয়া থাকবে না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে জনসেবা করার সুযোগ পাবেন। কাউকে খুশি-অখুশি করার কিছু থাকবে না। উন্নয়ন স্থায়ী হবে। শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ৮ এপ্রিল পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভা থেকে আঞ্চলিক পরিষদসহ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে নির্বাচনের জন্য সুপারিশ করে।

কৃতজ্ঞতা: বাংলা ট্রিবিউন