॥ বিশেষ প্রতিনিধি ॥

পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন শান্তিবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত অসংখ্য হত্যাকান্ডের মধ্যে অন্যতম হল ১৯৮৬ সালের ২৯ এপ্রিলে সংঘটিত তিন তিনটি গণহত্যা। এগুলো হলো- পানছড়ি গণহত্যা, দিঘীনালা গণহত্যা ও মাটিরাঙা গণহত্যা।

সেদিন দিবাগত রাত আনুমানিক ৯টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত একযোগে চালানো হয় পানছড়ি গণহত্যা, দিঘীনালা গণহত্যা ও মাটিরাঙা গণহত্যা।

এদিনে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার লোগাং, চেঙ্গী, পানছড়ি, লতিবান, উল্টাছড়ি এই ৫টি ইউনিয়নের ২৪৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙালী গ্রামে যেমন- দীঘিনালা উপজেলার মেরুং, বোয়ালখালী, কবাখালী, দিঘীনালা, বাবুছড়া এই ৫টি ইউনিয়নের ২৪৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙালি গ্রামে এবং মাটিরাঙা উপজেলার তাইন্দং, তবলছড়ি, বর্ণাল, বেলছড়ি, আমতলি, গোমতি, মাটিরাংগা, গুইমারা এই ৮টি ইউনিয়নের ৩২৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙালী গ্রামে অগ্নিসংযোগসহ লুটতরাজ, হত্যা, বাঙালী নারীদের গণধর্ষণ ও পরে হত্যা করে নারকীয়তা সৃষ্টি করেছিলো সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এর সশস্ত্র সংগঠন শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসীরা।

  • Facebook
  • Twitter
  • Print Friendly

মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ের মধ্যে তারা পানছড়ি এলাকায় ৮৫৩ জন, দিঘীনালা এলাকায় ৮৯৮ জন এবং মাটিরাঙা এলাকায় ৬৮৯ জন নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালী নারী, শিশু, আবাল-বৃদ্ধ বনিতাকে হত্যা করে। হাত-পা বেঁধে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে, দা-দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে, জবাই করে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে, বেনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নানা ভাবে কষ্ট দিয়ে হত্যা করেছিল এই অসহায় বাঙালী মানুষগুলোকে। প্রতিটি লাশকেই বিকৃত করে সেদিন চরম অমানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তারা।

ওই ঘটনায় পানছড়ি এলাকায় আহত হয় ৫০০ জনের অধিক বাঙালি। ৬২৪০টি বাঙালিদের বাড়ি লুটতরাজ করে সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয় উপজাতি সন্ত্রাসীরা।

দিঘীনালা এলাকায় আহত হয় ১২০০ জনের অধিক বাঙালি। ৭৩০৪টি বাড়ি লুটতরাজ করে সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয় উপজাতি সন্ত্রাসীরা। মাটিরাঙ্গা এলাকায় আহত হয় ৮০০ জনের অধিক বাঙালি। ৯০৪৮টি বাড়ি উপজাতি সন্ত্রাসীদের কর্তৃক লুটতরাজ করে সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয়া হয়।

তিনটি ঘটনাতে অপহরণ ও গুমের শিকার হয় কয়েক হাজার বাঙালী। সেদিন কতিপয় বাঙালী প্রাণে বেঁচে গেলেও এই ঘটনায় গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার বাঙালী পরিবার। ঘটনাটি স্ব-চক্ষে দেখা এবং বেঁচে যাওয়া কিছু কিছু সাক্ষী আজো আছে। কিন্তু ঘটনার বীভৎসতার কথা মনে পড়লে আজও তাদের চোখে মুখে আতঙ্ক ফুটে ওঠে।

এসব গণহত্যার কোন বিচার হয়নি, সরকারও বরাবরই পার্বত্য বাঙালীদের হত্যার বিষয়টি গোপন রেখেছে। উপজাতীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পাহাড়ে অপহরণ গুম খুন চাঁদাবাজী সন্ত্রাসী করে বরাবরই পার পেয়ে যাচ্ছে। সরকার কার্যকর কোন ব্যাবস্থা নিচ্ছে না।

পাহাড়ে শান্তির পথে প্রধান বাঁধা হলো উপজাতীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো। তাই সন্ত্রাসী বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোকে দমন করতে ও পাহাড়ে সংগঠিত সকল গণ হত্যার বিচার করতে সরকারের প্রতি পার্বত্য নাগরিক পরিষদ ও পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদ রাঙামাটি জেলা শাখার পক্ষ হতে জোর দাবী জানিয়ে আসছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সেদিনের ভয়াবহ গণহত্যা ও বাঙালী নিধনের কথা আজ ইতিহাসের অন্তরালে স্মৃতির ধুলার ঢাকা পড়ে অনেকটা বিবর্ণ হয়ে গেছে। তবে তাদের প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে আজো পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অখন্ড ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে টিকে আছে বাংলাদেশের মানচিত্রে।