॥ দীপ্ত হান্নান ॥

বিএনপি-আওয়ামী লীগ নিয়ে কোন ট্রল নেই ফেসবুকে। গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে মাদকবিরোধী অভিযান। জিএফ-বিএফ আপাততঃ অপশনাল সাবজেক্ট।

ঈদের সেমাই-নুডলস পানসে হয়ে গেছে। স্টার জলসা, স্টার প্লাস বা সনিতে ধস নেমেছে। পুরো জাতি এখন আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলকে নিয়ে। দেশের ফেসবুক এখন এ দুটি দলের সমর্থকদের দখলে।

যে যেভাবে পারছে ট্রল করছে, উপদেশ দিচ্ছে, বাঁশ দিচ্ছে, তুলোধুনো করছে। ফুটবল বিশেষজ্ঞ বনে বসে আছে। প্রেডিক্টশন করছে, গরু-ছাগল-শুকর-উঠকে জ্যোতিষী বানিয়ে। সবাই আছে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলকে নিয়ে উন্মাদনার শীর্ষে। কেন করছি, কি হয় আমাদের আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল?

ফুটবল পাগল জাতি হিসেবে আমাদের ইতিহাসটা অনেক লম্বা। এদেশের মানুষ ক্রিকেটকে ভালবাসতে শিখেছে ৯৭ এর আইসিসি ক্রিকেট টুর্ণামেন্টে থেকে। এর আগে পুরো জাতির অস্তিত্বে মিশে ছিল মোহামেডান, আবাহনী, মুক্তিযোদ্ধা, ব্রাদার্স এর মধ্যকার ফুটবল ম্যাচগুলি। হৃদয় গহীনে তখন সালাউদ্দিন, আসলাম, মুর্শেদী, সাব্বির, রুমি, কায়সার হামিদ, মোনেম মুন্না, কানন, জাকারিয়া পিন্টুরা। পরে এল আলফাজ, নকিব, রকিব, আরমান, হাসান আল মামুন, মামুন জোয়ার্দাররা।

ফুটবলের স্বর্ণযুগে তখন বাংলাদেশ। আবাহনী-মোহামেডান-মুক্তিযোদ্ধা-ব্রাদার্স ম্যাচগুলো উফ, কি উন্মাদনা, কি উচ্ছাস, কি উত্তেজনা। শুধু তাই নয়, যেখানে ফুটবল ম্যাচ, সেখানেই দর্শকের ঢল নেমেছে।

যদিও বা, এদেশের ফুটবল সেভাবে উত্তরণ ঘটাতে পারেনি। তাতে কি? ভালোবাসাটা এক ফোঁটাও কমেনি। সেটা বোঝা যায়, বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই। যেখানে দুটি নাম যখন ঝলমল করে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল। আমাদের পাগলামি দেখে কে আর। অন্ততঃ বাড়ির ছাদগুলো দেখলে বোঝা যায়, যেন আর্জেন্টিনা- ব্রাজিলের কোন শহর।

শুনতে শুনতে, দেখতে দেখতে আমরা এ দেশের ফুটবল ভক্তরা আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থক। সেটা আজকের নয়। ৭০ দশকে পেলে আর আশির দশকে ম্যারাডোনার খেলা দেখেই। শুধু তাই নয়, দুদলেই ছিল অসাধারণ কিছু ফুটবল প্লেয়ার। যাদের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ছিল চোঁখ ধাধানো।

বলা চলে, ফুটবলের সৌন্দর্য্য, আকর্ষন বিশ্বের কাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছিল ল্যাতিনরাই। চোখ সরানো দায় ছিল মাঠের খেলা থেকে। আমার ফুটবল ভালবাসা শুরু ৯০ বিশ্বকাপ দিয়েই। মনে প্রাণে ধারণ করে নিয়েছিলাম আর্জেন্টিনাকে। চোখে এখনও ভাসে, ম্যারাডোনা ও ক্যানেজিয়ার দ্বৈরথ। আর গায়কোসিয়ার অসাধারণ গোল কিপিং। পরে এল বাতিস্তুতা, হার্নান ক্রেসপো, ওর্তেগা, ভেরন. সিমিওনি, লোপেজ। এরপর দায়িত্ব নিল মেসি, আগুয়েরো, তেভেজ, হিগুয়ান, রিকুয়েলমে, ডি মারিয়া।

এখন দলটির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে একঝাঁক উদীয়মান তারকা। শুধু আমি নই, এদেশের লক্ষ কোটি দর্শকের ভালোবাসার নাম আর্জেন্টিনা। পিছিয়ে ছিল না, ব্রাজিলও। পেলেকে দিয়ে শুরু, তারপর একে একে রোনাল্ডো, দুঙ্গা, লিওনার্দো, রাই, কাকা, রবার্টো কার্লোস, বেবেতা, রোমারিও, তাফারেল, রিভালদো, কাফু, রোনালদিনহো, রবিনহোরা এসে মাঠ মাতাল। তারপর থেকে এই দলটির দায়িত্ব নিল নেইমার, দানি আলভেজ, মাইকন, সিলভা, লুইস, মার্সেলো, অস্কার, পলিনহো, কৌতিনহোরা।

ব্রাজিল জিতেছে ৫ বার শিরোপা, আর্জেন্টিনা ২ বার। ব্রাজিল শিরোপা বঞ্চিত ১৬ বছর, আর্জেন্টিনা ৩২ বছর। এতগুলো বছরেও দুটি দলের সমর্থকদের ধৈর্য্যর বাঁধ একটুও কমেনি। বরঞ্চ, লাতিন ফুটবলের তারকাদের দুত্যিপুর্ণ খেলায় সমর্থকদের পাল্লা ভারী হয়েছে। বেড়েছে নিজেদের মধ্যে যুক্তিতর্কের মধুর প্রতিযোগিতা।

দুটি দলের ভালোবাসায় বুদ হয়ে থাকা সমর্থকদের উপচে পড়া ভালোবাসা দেখা মিলে বিশ্বকাপ এলেই। দুটি দলের পক্ষে যুক্তি খন্ডন করার প্রতিযোগিতায় এখন ব্যস্ত সময় কাটছে সবার। হচ্ছে মোটর র‌্যালী, ঝড় উঠছে আড্ডার টেবিলে। বাদ যাচ্ছে না ঘরের ড্রইং বা ডাইনিং রুমেও।

আর প্রিয় দলের জার্সি পরে নিখাদ খেলোয়াড় বনে যাওয়ার সংখ্যাও কম নয়। কোন কিছুতেই মন নেই কারো, আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ছাড়া। না রাজনীতি, না অর্থনীতি, না অফিস, না ঘর, কোন কিছুতেই মন নেই। নিজেদের ভালোবাসার পুরোটাই জুড়ে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল।

এত ভালোবাসায় শিরোপার অপ্রাপ্তির ব্যবধান বাড়তে থাকলেও, কম কি দিচ্ছে? মধুর যুক্তিতর্কে দিনরাত পার হচ্ছে, চিন্তা-চেতনায় শুধুই আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল, শুধুই বিশ্বকাপ। না হয়েও আমাদের কাছে অনেক কিছু এই আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল। রক্তে আর আত্মায় মিশে থাকা দুটি নাম।