॥ দীপ্ত হান্নান ॥

একজন টিটু বাঙালীর কিউট বেবি প্রতিযোগিতা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে সরগরম ফেসবুক। টাইমলাইনে চোখ বুলালেই শুধু নাদুস নুদুস আদুরে সব বাচ্চাদের ছবি। সব বাচ্চাই প্রতিযোগি। বাচ্চাদের বাবা-মা, আত্বীয়সজন সকলেই লাইক-কমেন্ট-শেয়ার চাইছে ফেসবুক বন্ধুদের কাছে। বিষয়টা আমার কাছে বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হল।

ফেসবুকের পাতা খুললেই যেখানে প্রতিদিন খুন-ধর্ষন-হত্যা-লুটতরাজের ছবি দেখতে দেখতে যখন ভীষন ক্লান্ত, তখন টিটু বাঙালীর এই কিউট বেবি প্রতিযোগিতার বাচ্চাগুলোর ছবি অহরহ টাইম লাইনে চলে আসা কিছুটা হলেও স্বস্তি-শান্তি ও সুন্দর আবহ তৈরি করেছে বলে মনে হল।

তবে, কিছুদিন যেতে না যেতেই যখন এ প্রতিযোগিতা ঘিরে সমালোচনা শুরু হল, তখন অবাক হলাম। অবাক না হয়ে পারনি, যখন দেখলাম প্রতিযোগির বাবা-মা বা স্বজনরা তীব্র সমালোচনার তীড় ছুড়তে লাগলো টিটু বাঙালীর দিকে।

কে এই টিটু বাঙালী? দেশের বাইরে ব্যবসা নিয়ে প্রবাস জীবন কাটানো টিটু বাঙালীর কি স্বার্থ দেশের মানুষের উপকার করা? প্রশ্নটা আমার নয়, অনেকের। যারা দেশের ভালবাসাটাকে অন্যচোখে দেখে তাদের। একজন টিটু বাঙালীর কেন এত গরজ? দরিদ্র মানুষ আর অসুস্থ রোগীর পাশে দাঁড়ানো, অগ্নিকান্ডে মানুষকে ঘর তুলে দেয়া, শীতার্ত মানুষকে শীতবস্ত্র পরিধান করানো!!! কিছু তো স্বার্থ আছে। স্বার্থ ছাড়া কি মানুষ এমনি এমনি এসব কাজ করে?

টিটু বাঙালীকে আমি যেভাবে চিনি,  তিনি একসময় তুখোড় ছাত্রনেতা ছিলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শন। যদিও বা তাঁর বাবা (ঝুন্টু মেম্বার) মারা যাওয়ার কারণে পারিবারিক দায়িত্ববোধের কারণে পাড়ি জমাতে হয়েছে দেশের বাইরে। কিন্তু, তাঁর প্রবাস জীবন থেকে যতুটুক জেনেছি, দেশ ছেড়ে গেলেও তার মন পড়ে থাকতো দেশের অসহায়, দুর্বল, সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের কাছে। আওয়ামী ঘরানার রাজনীতি করলেও, প্রতিপক্ষ বন্ধুদের যেকোন প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর নজীরও তিনি দেখিয়েছেন।

বাড়িয়ে বলছি না, যারা টিটু বাঙালীকে চিনেন, জানেন, বুঝেন তারা একবাক্যে স্বীকার করে নিবেন এ কথাটি। তাঁর জীবনটাকে এপোড়-ওপোড় ঘেঁটে মনে হল না, তিনি ভবিষ্যৎ কোন বড় পদের জন্য এসব করছেন। মোটেই মনে হচ্ছে না। তবুও এই টিটু বাঙালীকে আমরা সমালোচনার উর্ধ্বে রাখতে পারলাম না। এটা মানসিক দৈন্যতা ছাড়া আর কি?

একদিন হঠাৎ করে টিটু বাঙালী ঘোষনা দিল, কিউট বেবি প্রতিযোগিতা করা হবে। অংশগ্রহণকারী বাচ্চাদের মধ্যে যে বাচ্চা লাইক-কমেন্ট-শেয়ারে এগিয়ে থাকবে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। হুমড়ি খেয়ে পড়লো সবাই। প্রতিযোগীতার দিন যতই এগুতে থাকে, নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে থাকে প্রতিযোগিতার এডমিন টিটু বাঙালী।

এক বা দুজন তো বলেই বসলো, মানসিক বিকৃতি সম্পন্ন মানুষরাই এমন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে!! এমন কথা আসলেই একটি বড় ধাক্কা, বড় হুমকি ভালো কাজের জন্য। তাহলে কি, বাচ্চাদের নাচ-গান-বিতর্ক-বৃত্তি-কবিতা আবৃত্তিসহ হরেক রকমের প্রতিযোগিতার আয়োজকগণ মানসিক বিকৃতির?

শুধু তাই নয়, প্রশ্ন উঠেছে লাইক-কমেন্ট-শেয়ারের অনিয়ম নিয়ে। ওগুলো নাকি অটো পাওয়া যায়!! যখন নাচ-গান-বিতর্ক-বৃত্তি-কবিতা আবৃত্তিতে লোক চক্ষুর আড়ালে বিচারক বা আয়োজকদের বলা হয়ে থাকে, ও বাচ্চাটা আমার, একটু দেখবেন!! তখন কি ওটা নিয়ম বা ন্যায়ের মধ্যে পড়ে?

জানি পড়ে না, না পড়ে বলেই প্রতিযোগিতায় ঠিকে থাকতে না পেরে শুরু হয় সমালোচনা, বিচারক কিছুই জানে না, আয়োজকরা কার কাছ থেকে টাকা খেয়েছে বা ফোন পেয়েছে কি জানি, এই সব কর্থাবার্তা। এই একটি জায়গায় টিটু বাঙালী একেবারেই নিখুঁত।

লাইক-কমেন্ট-শেয়ার দিতে তাঁর কোন সুযোগ নেই, তিনি দিন গুনবেন, সময় গুনবেন। সময় শেষ হলেই তাঁর দেয়া শর্ত অনুযায়ী তিনি বিজয়ী ঘোষনা করবেন।

কিন্তু সবশেষ তিনি সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঘোষনা দিলেন, প্রতিযোগিতার সব বাচ্চাকেই পুরস্কৃত করবেন। বুঝলাম তিনি কষ্ট পেয়েছেন, মনোযন্ত্রনায় ভুগেছেন কিন্তু হতাশ হননি। তিনি উৎসাহ পেয়েছেন, শক্তি খুঁজে পেয়েছেন।

তিনি আবারো প্রমান করলেন, তার মনে দৈন্যতা ও সংকীর্নতার কোন জায়গা নেই। তিনি যাই ভাবেন, যাই করেন নিঃস্বার্থ ভাবে করেন, অন্যের জন্য করেন। লাভ-লোকসান হিসেব না করেই করেন। এই করাটাকেই তিনি ধর্ম মনে করেন।

এবার আসি আমার মেয়ের কথায়। সবাই যাকে এংগরি বার্ড বলে চিনে, তার নাম হচ্ছে নাজিয়া হান্নান সাফরিন। কিউট বেবি প্রতিযোগিতার একজন প্রতিযোগি। আমি জানি না, তার লাইক কমেন্ট শেয়ার কতটা পেয়েছে। এটা ধ্রুব সত্যি।

এতগুলো কিউট বেবির মাঝে নিজের মেয়ের ছবিটা খুঁজে নিতে পারি না। ও জানতে চায়, কতটা পেয়েছি? আমি তাকে বলি, পুরো জীবনটাই একটা প্রতিযোগিতা। যোগ্যতা বলেই, এগুতে হবে। সেটা করতে হবে পরিশ্রম আর একাগ্রতা দিয়ে। কেউ তোমাকে টেনে তুলে নিবে না, নিজেকে উঠতে হবে। ও মাথা নাড়ল। আশ্বস্ত হলাম, বুঝাতে পেরেছি।

টিটু বাঙালীর সব উদ্যোগকেই আমি স্বাগত জানাই। দেশের মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ আছে এই বাঙালীটির মাঝে। বিশেষ করে রাঙামাটি মানুষদের জন্য। আমরাই বা কি করছি? খাচ্ছি-ঘুরছি-ঘুমচ্ছি। কিউট বেবি প্রতিযোগিতা নিয়ে কিছু মানুষের প্রশ্ন বানে যখন তিনি জর্জরিত, তখন বৃহৎ একটি অংশ তাঁর উদ্যোগ, তাঁর চিন্তা-ভাবনাকে স্যালুট জানিয়েছেন। অনেকেই লিখেছে, ভাল কাজের সমালোচনা হবেই, এগিয়ে যান প্রিয় টিটু বাঙালী।

আমিও বলবো, দারিদ্রতা আমরা করবো জয় দিয়ে যে যাত্রা আপনি শুরু করেছেন, সেটা যেন অব্যাহত থাকুক। মন্দ লোকেরা কখনও, কোনকালেই ভাল কাজের প্রশংসা করেনি। কারণ তারা চায়, নিজের লোক দেখানো প্রচার-প্রসার ও সস্তা জনপ্রিয়তা। পরিশেষে মনে কিরয়ে দিতে চাই সমালোচনা হলেই মনে করবেন, আপনি সঠিক পথে আছেন।