মঈন উদ্দীন বাপ্পী । হিলরিপোর্ট

রাঙামাটি: রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ভাষায় রাজনীতির বিভিন্ন সংজ্ঞা থাকলেও বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সরল বাক্যে বলা যায়- রাজনীতি মানুষের জন্য, জনকল্যাণের জন্য, দেশের জন্য।

রাজনীতি দু’ধরণের ধারায় অতিবাহিত হয়। এক সংগঠন ভিত্তিক রাজনীতি অপরটি ভোটের রাজনীতি। ভোটের রাজনীতি যারা করেন, তাদের বলা হয়- জনমানুষের নেতা, গণ মানুষের নেতা। তাদের কাছ থেকে জনগণ আশা-প্রত্যাশা বেশি করে। কারণ তারা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে মসনদের গদীতে আসীন হয়।

কিন্তু বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে জনগণের ভোটে নির্বাচিত অনেক জনপ্রতিনিধি ভোটে জয়লাভ করে গদিতে আসীন হওয়ার পর তারা সেইসব দিনের কথা বেমালুম ভুলে যায়।
অথচ তারা ভোটের আগের দিন একটি ভোট চাইতে বেইশ্যা, বস্তি, হিজড়া, শহর, নগর সব পথ মাড়ায়। যেখানে যাকে যা বলা দরকার তাই বলে বেড়ায়। তাদের সেইসব বলা মুখের বুলিগুলি জিতার পর ভুলে যান।

তারা কেন বা গদিতে আসীন হয়েছেন সেই কথাও বেমালুম ভুলে যান। তারা গদিতে বসে রঙিন স্বপ্নে বিভোর থাকে। মনে করে এই চেয়ার থেকে তাকে কেউ সরাতে পারবে না। চিরদিনের ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন।

তারা যখন আবার বাস্তবতার মুখোমুখি সন্মুখীন হন তখনি আবার সেই বেইশ্যা, বস্তি, হিজড়া, শহর, নগর সব পথ মাড়ায় নতুন কৌশল নিয়ে। বাস্তবতার নিরিখ বড় কঠিন। জনগণও এত বোকা না। তারা মনে রাখে, সব মনে রাখে। এটা যে ভোটের রাজনীতি। সময় মতো তারাও প্রয়োগ করে।

এইবার বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া যাক। রাঙামাটি সদর উপজেলায় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে বিজয়ী তিনজন জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। সারাদেশের ন্যায় আমলাতান্ত্রিক কিছু জটিলতা থাকার কারণে এই প্রতিষ্ঠানটিতে ইউএনও নির্ভর প্রতিষ্ঠানও বলা হয়।
তবে তাই বলে কি জনগণের ভোটে এই প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত জনপ্রতিধিদের জনগণের প্রতি কোন দায়িত্ব নেই। যদি দায়িত্ব না থাকে তাহলে তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে জনগণের লাভ কি? প্রশ্ন রাখলাম…

নির্বাচিত এইসব জনপ্রতিনিধিরা কি সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন না। মর্যাদা নিয়ে চলাফেরা করছেন না। উত্তরে হ্যা সবই করছে।

এই প্রতিষ্ঠানটির নির্বাচিত চেয়ারম্যানের কথায় পরে আসে। চেয়ারম্যান ছাড়াও এই প্রতিষ্ঠানে দু’জন ভাইস চেয়ারম্যান থাকে। একজন পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান এবং আরেকজন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান।

পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যানের নাম দূর্গেশ্বর চাকমা এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের নাম নাসরিন ইসলাম। চেয়ারম্যানের মতো তারাও জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতার গদিতে আসীন হয়েছেন। একদিন তারাও জনগণের দোয়ারে দোয়ারে ভোট ভিক্ষা করেছেন। তারা জনগণকে কথা দিয়েছিলেন ভোট জয়লাভ করলে তারা জনগণের আশা-ইচ্ছা সব পূরণ করবেন।

ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর তারা সরকারি সকল সুযোগ সুবিধা সমান ভাবে ভোগ করছেন। সরকারি সকল অনুষ্ঠানে দু’চারটা লেকচার দিয়ে দায়িত্বে গন্ডি শেষ করছেন।
বর্তমানে সারাবিশ্ব আজ মহা সংকটে দিন পার করছে। করোনার রাহুর গ্রাসে চারদিক মৃত্যুর মিছিল। কোটি কোটি মানুষ বেকার হয়ে পড়ছে। বাচার জন্য তারা ঘরবন্দি।

বাংলাদেশও এর বাইরে নেই। সরকার কোটি কোটি টাকা এবং খাদ্য সামগ্রীর প্রণোদনা দিয়ে দেশের জণগণের মুখে আহার তুলে দিচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু সরকার একা চাইলে এই দুযোর্গ মোকাবিলা করা কখনো সম্ভব নয়। এজন্য সমাজের জনপ্রতিনিধি, উচ্চবিত্ত সকলকে এই দুযোর্গ মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে।

এইবার আসা যাক জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি রাঙামাটির সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যানরা এই দুর্যোগময় মূহুর্তে তাদের নির্বাচনী এলাকার জনগণের জন্য কি করছেন।

দূর্গেশ্বর চাকমা। তার রাজনীতির তেমন কোন পরিচয় মিলেনি। তিনি নৌকার সমর্থন পেয়ে পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান পদে জনগণের ভোটে নির্বাচন করে জয় লাভ করেছেন।

অপরদিকে নাসরিন ইসলাম এক সময় রাঙামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রদলের নেতৃ ছিলেন এবং সেই দলের তুখোর রাজনীতিবিদ ছিলেন। এরপর বছর দু’য়েক আগে আ’লীগের এক নেতার হাত ধরে রাঙামাটি পৌর শাখার কৃষকলীগের মহিলা সম্পাদিকার পদ বাগিয়ে নিয়েছেন ।

এরপরই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আ’লীগের যোগ্য নেতৃত্ব থাকার পরও কোন এক অদৃশ্য শক্তির বলে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার টিকিটও নিজ দখলে নিয়ে নিয়েছেন তিনি এবং আ’লীগের সমর্থন পেয়ে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন।

করোনার ক্রান্তিকালে দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে পার করছে। সরকার বারবার বলছে, হত দরিদ্রদের জন্য জনপ্রতিনিধি এবং উচ্চবিত্তদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে।

নির্বাচিত এই দুই ভাইস চেয়ারম্যান সরকারি ত্রাণ প্রদানকালে নিজেদের উপস্থিতি রাখা ছাড়া জনগণের জন্য আর কিছু করতে দেখা যায়নি। অথচ তারা নির্বাচনে জনগণের দু:সময়ে পাশে থাকার কথা দিয়েছিলেন।

এইবার সার্বিক বিয়য় নিয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাঙামাটি সদর উপজেলার দু’জন ভাইস চেয়ারম্যানের কাছে হিলরিপোর্টের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো:-

রাঙামাটি সদর উপজেলার পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান দূর্গেশ্বর চাকমা বলেন, আমরা প্রতিটি ইউনিয়নে ত্রাণ দিয়েছি। আপনি দেখছেন না…
সাপছড়ি, বন্ধুক ভাঙ্গা, মগবান এবং বালুখালিতে ত্রাণ দিয়েছি। সরকার যেগুলো দিয়ে দেয় সেগুলো আমরা দিয়ে দিয়। আপনি ব্যক্তি উদ্যোগে জনগণের জন্য কিছু করেছেন কিনা এমন প্রশ্নে এই আরকি টুট.. টুট..টুট।

মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নাসরিন ইসলাম বলেন, প্রশ্নবিদ্ধ আপনারা হচ্ছেন না, আমরাও প্রশ্ন বিদ্ধ হচ্ছি। প্রশাসন যদি পরিষদকে কিছু না দেয় তাহলে আমরা কি করবো? প্রশাসন আমাদের আমতান্ত্রিক ভাবে ছাপ দেয়। আমাদের কি করার আছে এখানে।

আমরা এখানে গেলে সমস্যা, ওখানে গেলে সমস্যা, প্রশাসন আমাদের কিছু জানায় না। আমরা জনপ্রতিনিধি হলেও আমাদের গালাগাল শুনতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, পরিষদের অধীনে আমি ৬টি ইউনিয়নের প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপহার এবং শিশু খাদ্য বিতরণ করেছি। আমার পরিষদের সকলে জানে।

এইবার আসা যাক একই প্রতিষ্ঠানের জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাঙামাটি সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুজ্জামান মহসিন রোমান এর কথা। তিনি করোনার বিপদের শুরু থেকে দিন-রাত তার নির্বাচনী এলাকার মানুষের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

সরকারি প্রণোদনা প্রদানের পাশাপাশি তিনি নিজ উদ্যেগে পুরো উপজেলার প্রায় দুই হাজার মানুষতে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। পাশাপাশি দূর্গম এলাকাগুলোতে নিজের কাধেঁ জীবাণুনাশক বক্স বহন করে দূর্গম এলাকাগুলোতে জীবাণু দূর করতে স্প্রে করছেন এবং জনগণের সুখ-দু:খের কথা শুনছেন। কি শহর- কি গ্রাম তার পদচারণায় মূখর পুরো এলাকা। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ এবং থানায় নিজ খরচে প্রদান করেছেন পিপিই। প্রচারণা চালাচ্ছেন করোনা সচেতনতায়।

তার অকপটে সহজ-সরল শিকারোক্তি- জনগণ আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। এখন সময় হয়েছে বিপদের সময় তাদের পাশে থাকার। কারণ আমি কথা দিয়েছিলাম দু:সময়ে আমি তাদের পাশে থাকবো।

উদাহরণ হিসেবে জনগণের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, রাঙামাটি শহরের আরেক তরুণ রাঙামাটি পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার ও প্যানেল মেয়র মো. জামাল উদ্দীন। তিনিও তার নির্বাচনী এলাকায় চষে বেড়াচ্ছেন। জনগণকে সরকারি প্রণোদনা প্রদানের পাশাপাশি তিনিও নিজ উদ্যোগে জনগণকে সহযোগিতা প্রদান করছেন। জনগণের সার্বিক বিষয়ে খোঁজ নিতে তিনি স্থানীয় মনিটরিং সেলও গঠন করেছেন। পাশাপাশি প্রশাসনের সাথে একাত্ব হয়ে কাজ করছেন অবিরাম।

বাস্তব সত্য হলো- কাজ করতে চাইলে কোন পদ-পদবি দরকার পড়ে না। প্রয়োজন নিজের ইচ্ছে শক্তি। আর কাজ না করতে চাইলে বড় পদ পদবি দিয়ে কিছুই করা যায় না।
তাই তো একটি চলমান বাক্য- বিবেক তুমি কোথায়? ‘আমি তোমার কফিনের পেরেকের উপর। বিবেক তুমি কোথায়? আমি তোমার কফিনের পেরেকের উপর।’ বিচারের ভার আপনাদের উপর ছেড়ে দিলাম……..