হিলরিপোর্ট ডেস্ক

রাঙামাটি: একশ’ কোটি টাকার টেন্ডার পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে দিতে দরপত্রের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে দু’বার। সংশোধনী আনা হয়েছে পাঁচবার। সময় বাড়ানো হয়েছে ছয়বার। নজিরবিহীন এ কাণ্ড ঘটেছে কাপ্তাইয়ে অবস্থিত দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিট সংস্কারের টেন্ডারে।

এভাবে সময়ক্ষেপণে অন্তত ২০০ কোটি টাকার ক্ষতিও হয়েছে সরকারের। সংস্কার কাজ যথাসময়ে হলে বিপুল টাকার এই বিদ্যুৎ যোগ হতো জাতীয় গ্রিডে। শুধু তাই নয়; পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে টেন্ডারের পর পাল্টে ফেলার চেষ্টা হয়েছে কপিরাইট নিয়মও।

যে প্রতিষ্ঠানের আবেদনে এত কাণ্ড, সেটির বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনায় কাজ করার পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই বলেও অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ করোনা পরিস্থিতির অজুহাত দিয়ে আবারও সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে তারা।

২৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এখন উৎপাদন করছে দৈনিক মাত্র ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। পাঁচটি ইউনিটের স্থলে বর্তমানে চালু আছে মাত্র দুটি ইউনিট। তিনটি ইউনিট বন্ধ থাকায় চালু থাকা দুটি ইউনিটকে এখন বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে। এতে তৈরি হচ্ছে ঝুঁকি; হচ্ছে আর্থিক ক্ষতিও।

গত ছয় মাসে এই ক্ষতির পরিমাণ কম করে হলেও ২০০ কোটি টাকা। কাপ্তাইয়ে উৎপাদিত প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাচ্ছে ১ টাকা ৫৩ পয়সা। এ হিসাবে ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুতে প্রতিদিন আসার কথা সাড়ে ৬ কোটি টাকা। কিন্তু টেন্ডার নিয়ে নানা টালবাহানায় পাঁচটি ইউনিটে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না গত ছয় মাস ধরে।

জানতে চাইলে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক এটিএম আবদুজ জাহের বলেন, এখন কেবল তিন ও পাঁচ নম্বর ইউনিট উৎপাদনে আছে। এ দুটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক গড়ে ৭৫ মেগাওয়াট। ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটে জেনারেটরসহ মালপত্র সরবরাহ কাজের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। কেন এখনও এটির টেন্ডার চূড়ান্ত হয়নি, তা আমার জানা নেই। এ ব্যাপারে ঢাকার দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

পিডিবির পরিচালক (ক্রয় শাখা) সৈয়দ একরাম উল্লাহর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য জানাতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, কেন টেন্ডার চূড়ান্ত হচ্ছে না, তা বলার এখতিয়ার আমার নেই। এটি নির্ধারণ করেন বোর্ড সদস্যরা। ওপর থেকে আসা সিদ্ধান্ত আমরা কেবল বাস্তবায়ন করি।

জানা গেছে, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৪ ও ৫ নং ইউনিটের জেনারেটরসহ মালপত্র সরবরাহ কাজের জন্য ডিপিএম (সরাসরি ক্রয়) পদ্ধতিতে প্রথম টেন্ডার আহ্বান করা হয় ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি। এতে অংশ নেয় জাপানের কপিরাইটপ্রাপ্ত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান তোশিবা এনার্জি সিস্টেম অ্যান্ড সলিউশান করপোরেশন।

কপিরাইট নিয়মানুসারে এ দুই ইউনিটের জেনারেটরসহ মালপত্র সরবরাহ ও সংশ্নিষ্ট কাজ করতে পারবে শুধু তোশিবা জাপান বা তাদের মনোনীত প্রস্তুতকারক। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের টেন্ডারেও এই শর্ত উল্লেখ আছে। অনুমোদনের জন্য তখন এ প্রস্তাবনা পাঠানো হয় পিডিবির ক্রয় কমিটিতে।

কিন্তু ল্যান্ডমার্ক নামে বাংলাদেশি একটি প্রতিষ্ঠান আরও কম দামে কাজ করবে বলে ক্রয় কমিটিতে প্রস্তাব দেয়। তারা ডিপিএম পদ্ধতির পরিবর্তে উন্মুক্ত ক্রয় পদ্ধতিতে টেন্ডার দেওয়ারও আহ্বান জানায়। তাদের কথায় সাড়া দিয়ে পিডিবি ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ফের টেন্ডার আহ্বান করে।

এবার দরপত্র দাখিলের সময় নির্ধারণ করা হয় ২০২০ সালের ২৭ জানুয়ারি। তবে এই দরপত্রে দরদাতাকে কর্মক্ষেত্র পরিদর্শনের শর্ত দেওয়া হয়। এ প্রেক্ষিতে ল্যান্ডমার্ক কোম্পানি তাদের মূল প্রতিষ্ঠান মেসার্স এডিসন ইন্ডিয়া ও মেসার্স ভাউওথ চায়নার হয়ে কর্মক্ষেত্র পরিদর্শন করবে বলে আবেদন করে। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তারা কর্মক্ষেত্র পরিদর্শন না করে আবার সময় বাড়ানোর আবেদন করে।

এমন আবেদন বারবার করায় পিডিবি নজিরবিহীনভাবে মোট ছয় দফা সময় বাড়ায়। সর্বশেষ করোনার অজুহাতে আবার সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে তারা। বারবার দুটি প্রতিষ্ঠানের আবেদনে এভাবে সময় বাড়ানো প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার শঙ্কা থাকায় আরও চারটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে এভাবে সময় বাড়ানোর আবেদনের কৌশল নেওয়া হয়। তাদের এই ফাঁদে পা দিয়ে গত ছয় মাসেও পিডিবি চূড়ান্ত করতে পারেনি সংস্কার কাজের টেন্ডার।

অভিযোগ আছে, টেন্ডারের শর্ত পাল্টাতে অভিন্ন ভাষার হুবহু চিঠি পাঠানো হয়েছে চীনা ও ভারতীয় এই দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে। অথচ বাংলাদেশের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮-এর ৭৬ ধারায় উল্লেখ আছে, ‘যদি পেটেন্ট, ব্যবসায়িক গোপনীয়তা ও একক স্বত্বাধিকারের (কপিরাইট) কারণে একই ধরনের পণ্য প্রস্তুতকরণে অন্যদের নিবৃত্ত রাখা হয়, সে ক্ষেত্রে কপিরাইটভুক্ত পণ্য ও সংশ্নিষ্ট সেবা কেবল একক কপিরাইটধারীর কাছ থেকে সংগ্রহ করতে সরাসরি চুক্তি প্রয়োগ করা যাবে।’

কিন্তু চার ও পাঁচ নম্বর ইউনিটে কাজ করতে তৎপর থাকা চীনা ও ভারতীয় প্রতিষ্ঠান তোশিবা জাপানের কাছ থেকে কোনো অনুমোদন নেয়নি। তারপরও তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে চার ও পাঁচ নম্বর ইউনিটের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, এ দুটি ইউনিটের টেন্ডারে যেসব মালপত্র সরবরাহের কথা বলা হয়েছে, তা এর আগে কখনোই সরবরাহ করেনি এসব প্রতিষ্ঠান।

কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ১৯৬২ সালে নির্মিত হয়। দেশের একমাত্র এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি প্রতি সেকেন্ডে পাঁচ লাখ ২৫ হাজার কিউসেক পানি নির্গমন করতে পারে। দুটি ইউনিট দিয়ে শুরু হওয়া এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা প্রথমে ছিল এক লাখ ২০ হাজার কিলোওয়াট। এখন পাঁচটি ইউনিট যুক্ত থাকায় মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক ২৩০ মেগাওয়াট। কিন্তু তিনটি ইউনিট বন্ধ থাকায় গতকালও উৎপাদন হয়েছে গড়ে ৭৫ থেকে ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

সূত্র: দৈনিক সমকাল