মঈন উদ্দীন বাপ্পী । হিলরিপোর্ট

রাঙামাটি: রাঙামাটি জেলায় এই বছর বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। বাম্পার ফলনে কৃষকদের চোখ-মুখেও নতুন স্বপ্ন জেগে ছিলো। কিন্তু মহামারী বৈশ্বিক করোনা কৃষকদের সেইসব স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়েছে। বর্তমানে ধান কাটার জন্য এবং মাড়ানোর জন্য পাওয়া যাচ্ছে না কোন শ্রমিক। করোনার কারণে পুরো দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় কোন শ্রমিক আনা যাচ্ছে না।

সামনে আসছে বর্ষা মৌসুম এবং কাপ্তাই হ্রদের পানি বৃদ্ধি পাবে। সময় মতো ধান গোলায় তুলতে না পারলে পাহাড়ী ঢলে উৎপাদিত সকল ধান নষ্ট হয়ে যাবে। কৃষি বিভাগও জোর তাগিদ- আশির ভাগ ধান পেকে গেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে ধান কেটে গোলায় তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন।

কিন্তু ধানের বাম্পার ফলনের দিনেরও কৃষকের মুখে হাসি ফুটছে না। ধান কাটার জন্য লোকবল নেই। আবার উৎপাদিত ধানের বাজার অনিশ্চিত। এসব ধান বাজারজাত করতে না পারলে তাদের যে খরচ হয়েছে তা পুষিষে নেওয়া কোন ভাবে সম্ভব না। যে কারণে তাদের বিরাট অংকের টাকা লোকসান গুনতে হবে, পড়তে হবে অর্থনৈতিক সংকটের মতো চরম ঝুঁকির মধ্যে।

সরেজমিনে গেলে দেখা গেছে, জেলা শহরের রাঙাপানি এলাকায় জলেভাসা জমির মধ্যে সোনালী ধান দূল খাচ্ছে। পুরো মাঠ যেন সোনালী রূপ ধারণ করেছে। সেই রূপে কৃষকরা এতদিন তাদের স্বপ্ন তৈরি করেছিলো। কিন্তু তাদের স্বপ্নটা এইবার অধরা থেকেই গেলো। মাঠের এইসব কৃষকদের কপালে দুশ্চিন্তার বড় ভাচ। মুখে নেই হাসির কোন ছোঁঁয়া।

কৃষাণী ববিতা চাকমা বলেন, অন্যান্য বছরের তুরনায় এই বছর ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। আমরা মনে করেছিলাম এই বছর আয়ের পরিধিটা বাড়িয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু দেশে কি রোগ এলো সকল যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। কোন শ্রমিক পাচ্ছি না ধান কাটার জন্য। তাই প্রতিদিন নিজের পরিবারকে নিয়ে অল্প অল্প করে ধান কেটে গোলায় তুলছি। কিন্তু মনে শান্তি নেই। ধান তুলে লাভ কি? বিক্রি করার সব জায়গা বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা পুঁজির টাকা কি ভাবে তুলবো জানা নেই। ক্ষতি হয়ে গেলে আমাদের।

কৃষক নীলু ভূষণ চাকমা জানান, তিনি এইবছর দুই বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন। কৃষি অধিদফতরের পরামর্শে গত বছরের তুলনায় এবছর ভালো ফলন হয়েছে বেশ।

তিনি আরও জানান, ফলন ভাল হলেও কোথায় বিক্রি করবো। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতির ভাল কোন সংবাদ নেই। উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য না পেলে আমরা খাবো কি?

তিনি আক্ষেপের সাথে বলেন, সারা বছর চলি এই ধান বিক্রির টাকা দিয়ে। এখন টাকা না পেলে সারাবছর কিভাবে চলবো তার কোন উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। এজন্য কৃষকেদের সহায়তায় তিনি সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।

রাঙামাটি সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আপ্রু মারমা জানান, করোনা পরিস্থিতিতেও চাষিদের বিভিন্নভাবে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তারা যেন বোরো ধানের ফসল তোলার পর আউশ ধান ও বিভিন্ন রকমের গ্রীষ্মকালীন শাক-সবজির চাষ করেন।

তিনি আরও জানান, আউশ ধানের জন্য ২০০ জন চাষীকে সরকারের প্রণোদনা হিসেবে বিনামূল্যে ধানের বীজ ও সার প্রদান করছে। যারা প্রান্তিক চাষী আছেন তারা যদি তাদের উৎপাদন ঠিক রাখতে পারে, তাহলে রাঙামাটিতে দানা জাতীয় খাদ্য সংকট থাকবে না বলে তিনি জানান।

রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সহকারি উপ-পরিচালক পবন কুমার চাকমা বলেন, এই বছর রঙাামাটিতে বোরো ধানের ব্যাপক বাম্পার ফলন হয়েছে। এই বছর পুরো জেলায় ৭ হাজার ১শত ৪৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ হাজার ১শত ৪০ হেক্টর। এবার লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৫ হেক্টর জমিতে বেশি চাষ হয়েছে। করোনার ক্রান্তিকালে ধান কাটার জন্য শ্রমিক সংকট দেখা দেওয়ায় হোন্ডা রিপার (ধান কাটার যন্ত্র) ব্যবহার করা হচ্ছে জমিতে।

তিনি আরও বলেন, যারা বোরো ধানের চাষ করেছে তাদের তালিকা খাদ্য অধিদফতরে পাঠানো হবে। যে কেউ চাইলে সরকারিভাবে তাদের ধান বিক্রি করতে পারবেন। ফলে ধানের দাম নিয়ে চিন্তার কোন কারণ নেই। তিনি আশা করেন, কৃষকরা তাদের ধানের ন্যায্য মূল্য পাবেন।