॥ দীপ্ত হান্নান ॥

ছয় ফুটের কাছাকাছি প্রানবন্ত, উদ্যমী আর ক্লান্তিহীন শরীরটার কোন কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। যেন অনাকঙ্খিত ঝড়ো হাওয়ায় দুমরে মুচরে যাওয়া একটি জীবন। হাসপাতালের বেডে লেপ্টে থাকা একটি মানব শরীর। হাড্ডিসার কংকাল জড়ানো চামড়া, বিধ্বস্ত, বিবর্ণ চেহারাটিই বলে দিচ্ছে তিনিই মোস্তফা কামাল।

রাঙ্গামাটি শহরের অত্যন্ত সর্বজন নন্দিত, শ্রদ্ধা  আর স্নেহের সাংবাদিক মোস্তফা কামাল। মিষ্টভাষী, সদালাপী এবং অসম্ভব রকমের ভাল মানুষ আমাদেরই মোস্তফা কামাল। এমন এক পর্যায়ে এসে বর্তমানে তার জীবনটা দাঁড়িয়েছে, যেন বেঁচে থেকেও প্রাণহীন। পুরোপুরি জীবনস্মৃত। অসাড়, শংকাময়। চলমান সময়ে আল্লাহর অপার রহমত ও মানুষের অশেষ দোয়ায় জীবনের কঠিন যুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়ে যাচ্ছেন।

যতটুকু জেনেছি, সদা প্রানবন্ত মোস্তফা কামালে চামড়া জড়ানো শরীরটার ভেতরে শুরুতে বিদ্রোহের দাবানল জ্বালিয়ে দিয়েছে ক্যান্সার। অপারেশন, কেমোথেরাপি, ব্যাগের পর ব্যাগ রক্ত নিয়ে ২০১২ সাল থেকে লড়তে লড়তে নতুন করে যুদ্ধ ঘোষনা করলো দুটি কিডনি। এতধকল একটা মানুষ কতটা সহ্য করতে পারে? সামান্য জ্বর হলেই আমরা চোখে মুখে অন্ধকার দেখি, কখনও কখনও মৃত্যুদুতকেও নিজের আশেপাশে অনুভব করি। সেখানে রিক্ত, নিঃস্ব, রোগের ভারে ন্যুহ শরীরটা কিভাবে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে বর্ষিয়ান এই সাংবাদিক? যদিও বা তাঁর মনের জোর এতটা বেশি, কোন কিছুতেই হারতে রাজী নন তিনি।

এত ধকল, এত যন্ত্রনায় দুমরে মুচরে যাওয়া এই শরীরটার সামনে দাঁড়ালেই হাসিমুখে জানতে চায়, কেমন আছি? সবাই কেমন আছে? বিস্মিত হই, শরীরের ভেতর কলকব্জার বিদ্রোহী যুদ্ধে প্রতিটি ক্ষন নিজের সাথে লড়তে থাকা মানুষটি কিভাবে এত শান্ত থাকতে পারে? কিভাবে এতটা নির্ভার থাকতে পারে?

২০১২ সালের জুনে শরীরে ধরা পরে ক্লোকরেটাল ক্যান্সার। তিন দফা অপারেশন, সাথে কেমো, রেডিয়েশন। চিকিৎসা চলে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও মুম্বাই (ভারত)। এ দফায় চিকিৎসা ব্যয় হয় কোটি টাকার উপরে। পুরোপুরি সুস্থ না হলেও ক্যান্সারের সাথে বন্ধুত্ব পেতে এরপর সময়টা ভালোই চলছিল। কাজ পাগল মোস্তফা কামালকে দমাতে পারেনি এসময়টুকুর মাঝে নিজের বিপরীতে চলা শরীরটা।

যদিওবা ব্যাগের পর ব্যাগ রক্তের উপর ঠিক রাখতে হয়েছিল রিক্ত-নিঃস্ব শরীরটাকে। ব্যস্ত সময়ের মাঝে হঠাৎ করে ২০১৮ সালে এসে এপ্রিলে আবারো বিদ্রোহের জানান দেয় শরীরের অভ্যন্থরে। এবার দুটি কিডনি যুদ্ধ ঘোষনা করে। আক্রান্ত হয় ইউডোলজী সমস্যায়। আবার ডাক্তার, হাসপাতাল, অপারেশন, ডায়ালিসিস। এ দফায় ব্যয় হয় ৭ লাখের উপর। এখন প্রতি সপ্তাহে ডায়ালিসিসে খরচ হয় ২৫ হাজার টাকা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজের সঞ্চিত অর্থ ও অনুদান দিয়ে চিকিৎসা খরচ চালানো হচ্ছে বলে তিনি ও তাঁর পরিবার সুত্রে জানা গেছে।

১৯৯০ সালে গিরিদর্পন পত্রিকায় পার্বত্য চট্টগ্রামের চারণ সাংবাদিক একে এম মকছুদ আহমেদ এর হাত ধরে সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। সাংবাদিকতা গোড়াপত্তনে ও ভিত মজবুতকরণে প্রয়াত শৈলেন দে ও সুনীল কান্তি দে,র অবদানও কম নয়। ৯২ থেকে ৯৯ পর্যন্ত দৈনিক বাংলার বাণী। ৯৮ এ যোগ দেন বিটিভি, ২০১৪ তে অবজারভারে। এখনও রয়েছে এ দুটিকে নিয়ে।

অনেক অর্জন নিয়ে নিজের জীবনকে সম্মৃদ্ধ করেছেন তিনি। যক্ষা বিষয়ক স্বাস্থ্য রিপোটিং এর জন্য পেয়েছেন ব্র্যাক জাতীয় মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড। সাংবাদিকতার পাশাপাশি ক্রীড়া ও স্কাউটিং এ তিনি ছিলেন অন্তপ্রান। এখনও তাঁর চিন্তা-চেতনায় ঘুরপাক খায় ক্রীড়া ও স্কাউটিং। যুক্ত রয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথেও।

যে সামাজিক সংগঠনগুলোর কাজই হচ্ছে সমাজের স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ মৌলিক অধিকার বঞ্চিত মানুষদের জন্য কিছু করা। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সাংবাদিকতা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, স্কাউটিং এর জন্য পেয়েছেন নানা সম্মাননা। সর্বশেষ দৈনিক রাঙামাটি পত্রিকার গুণীজন সংবর্ধনা ও সম্মাননা দুটোই পেয়েছেন। শিক্ষক হিসাবে তাঁর পরিচিতি ব্যাপক ও বিস্তৃত। রাঙ্গামাটি শিশু নিকেতনে শিক্ষক হিসেবে শুরু, পরে নিজ যোগ্যতায় অধ্যক্ষ হিসাবে স্কুলটিকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তারই হাত ধরে যারা জ্ঞান অর্জন করেছেন, অনেকেই আজ নিজ নিজ জায়গায় সফল।

মাত্র ৪৪ বছর বয়স। বিদ্রোহী শরীর, কমব্যস্ত জীবন নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে তিনি সন্তুষ্ট। সংসার জীবনে এক স্ত্রী (জাহেদা) ও এক মেয়ে (তোরশা)। কিডনি আক্রান্ত হয়ে তিনি যখন পিজি হাসপাতালে বেডে শুয়েছিলেন, তখন তিনি কিছু স্ট্যাটাস লিখেছিলেন পরিবারকে নিয়ে। তিনি মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন এমন একজন নিবেদিত সহধর্মিনী জীবনসঙ্গী হিসেবে দেয়ার জন্য। ছয় বছর বয়সী তোরশা তাঁর কলিজার টুকরো। ছোট এই মেয়েটার জন্য অনেক চিন্তা। ভালবাসার সবটুকু কেড়ে নেয়ার মতই তোরশা।

জীবনে পরতে পরতে ছোট-খাট অপ্রাপ্তি থাকলেও, সামগ্রিকভাবে বয়সের মধ্যগগণে এসেও বেজায় সন্তুষ্ট তিনি। এই সময়টুকুর মধ্যে অগনিত মানুষের ভালবাসা পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়।

মোস্তফা কামাল পেয়েছেন, হাতভরে পেয়েছেন, মন ভরে পেয়েছেন, ভালবাসা , স্নেহের, আর শ্রদ্ধা। এত অসুস্থতার মাঝে তাঁর চলমান জীবনেও ভাবতে থাকেন পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, সর্বপরি রাঙ্গামাটির মানুষদের নিয়ে।

তিনি জীবনের শেষ পর্যন্ত শুধু মানুষের ভালবাসা ও দোয়া কামনা করছেন। তাঁর নিস্পলক চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে অনায়াসে পড়ে নেয়া যায় কি বলতে চায়? মুখ ফুটে না বললেও তিনি বলতে চান, এ শহরের প্রতিটি মানুষকে আমি হৃদয়ের গহীন থেকে ভালবাসি, তাই একজন মোস্তফা কামালকে কেউ যেন কখনও না ভুলে।

এই মানুষটার কাছাকাছি থাকার সুযোগ হয়েছে আমার, শিখেছিও অনেক। শুধু আমি নই, আমার মত অনেকেও। তাঁর মোহ জাগানিয়া উপস্থাপনা, মুগ্ধ করা হাতের লেখা এখনও মিস করি। সাংগঠনিক পরিচালনাতেও তাঁর রয়েছে অসাধারণ দক্ষতা।

তিনি পারেন বলেই, করে দেখান। করতে ভালবাসেন। অত্যন্ত শান্তশিষ্ট এই মোস্তফা কামালের বলার ধরণও আকর্ষনীয়। বিশেষ করে, জাতীয় দিবস থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি বা বেসরকারী অনুষ্ঠানে উপস্থাপনায় তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়।

রাঙ্গামাটির এ শহরে একজন মোস্তফা কামালকে তৈরি হতে হয়েছে নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে।  সেই মানুষটার আজ রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম-ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজনে বিরামহীন দৌড়াদৌড়ি।

পাতলা গড়নের শরীরটা ক্রমশঃ এত ধকলের ভারে ন্যুহ প্রায়। এ অসুস্থ্য অবস্থায়ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে তিনি কখনো পিছপা হননি। এখনো বিটিভির স্পেশাল রিপোটিং এ তার সচিত্র প্রতিবেদন স্বকন্ঠে প্রচারিত হচ্ছে। খবরের শেষে শোনা যায় সেই চিরচেনা কন্ঠ..মোঃ মোস্তফা কামাল, বাংলাদেশ টেলিভিশন, রাঙ্গামাটি।

ঠিক যেভাবে ২০১৭ সালের ১৩ জুনের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দূর্যোগের পর প্রতিদিন বিটিভির সংবাদে উঠে আসতো রাঙ্গামাটি থেকে বিস্তািরত জানাচ্ছেন মোঃ মোস্তফা কামাল।

এত কিছুর পরও আল্লাহ ভাল জানেন বা আল্লাহর কাছে কতটা প্রিয় সাংবাদিক মোস্তফা কামাল? কবে এই বিরামহীন দৌড়ের একটি সুন্দর, শংকাহীন সমাপ্তি ঘটাবেন। ফিরে আসবেন প্রিয় রাঙ্গামাটির বুকে, প্রিয় মানুষদের কাছে। সকলের প্রিয় মোস্তফা কামাল উদ্যমী, তেজদীপ্ত হয়ে ফিরে আসুক, এমন একটি ভাল খবরের অপেক্ষায় রইলাম।