॥ মঈন উদ্দীন বাপ্পী ॥

রাঙামাটি: পাহাড়ি জনগোষ্ঠির ঐতিহ্যর চাষাবাদ হচ্ছে জুম। বর্তমান সময়ে পাহাড়িরা অন্যান্য পেশা গ্রহণ করলেও এখন পর্যন্ত জুম ফসল তাদের ভরসার প্রতীক। বছর শেষে গোলায় ভরে সোনালি পাকা ধান। সাথে তুলে অন্যান্য ফসল।

এদিকে জুমের ফসলে পাহাড় সেজেছে নবরুপে। একদিকে পাকা সোনালী ধানের মৌ মৌ গন্ধ অন্যদিকে সাথী ফসলের পসরা পাহাড়কে অন্য রূপ দিয়েছে। তাই এসর ফসল দেখে পাহাড়ি পরিবারগুলোর চোখে মুখে হাসির ফুলকি ঝড়ছে। তাদের ঘরে চলছে উৎসবের আমেজ।

পাহাড়ে কিছু কিছু জায়গায় পাকা ধান কাটা শুরু হয়েছে। গোলায় পাকা ধান তোলার জন্য জুমিয়ারা ব্যস্ত সময় পার করছে। আর যাদের ধান এখনো পাকেনি তারাও ধান গোলায় তোলার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। গত বছর পাহাড় ধসের কারলে জুমের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ বছর প্রকৃতি অনুকূলে থাকায় জুমের ভাল ফলন হয়েছে।

জুমিয়ারা ফাল্গুন-চৈত্র মাসে পাহাড় পরিছন্ন করে জুম ফসল চাষের উপযোগী করে তোলে। এরপর বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসে গর্ত করে ধান, মারফা, মিষ্টি কুমড়া, তুলা, তিল, শিম, আদা, ভুট্টাসহ নানা ফসল রোপন করে।

রোপনের তিনমাস পর তথা ভাদ্র মাস হতে এসব ফসল ঘরে তোলার ধূম শুরু হয়। অগ্রহায়ন মাস পর্যন্ত উৎপাদিত এসব ফসল পর্যায়ক্রমে ঘরে তোলে জুমিয়ারা।

সরেজমিনে গেলে জেলা সদরের কাপ্তাই-রাঙামাটি বিকল্প সড়কের মোরঘোনা এলাকার বাসিন্দা জুম চাষী বিপুল চাকমা বলেছেন, গত বছর পাহাড় ধসে জুমের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং জায়গার সংকুলান হয়েছে। তবে আশা করছি আবহাওয়া এ বছর ঠিক থাকায় ফসল ভাল পাবো।

জুমিয়া বিপুল অভিযোগ করেন, জুম চাষের সমস্যা হলেও কৃষি কর্মকর্তারা কোনও খবর নেয় না। কৃষি বিভাগ যদি উন্নত জাতের ধান, ফসলের বীজ দিতো তাহলে ফলন ২-৩ গুণ বাড়তো।

বড়গাঙ এলাকার জুম চাষি মঙ্গল চাকমা জানিয়েছেন, গত বছর জুমে ২০ কেজি ধান রোপণ করে ৪-৫ বস্তা ধান পেয়েছিলাম। এ বছর উৎপাদন বাড়তে পারে। গত বছরের তুলনায় এবারে জুমে ফলন ভালো হয়েছে বলে জানান এ জুমিয়া।

কৃষি সম্প্রসাণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে জুমের ধান আবাদের। তবে আবাদ করা হয়েছে ৫ হাজার ৪০ হেক্টর জমিতে। এ জমি থেকে এবার ৫ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন ধান পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ।

রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা কৃষ্ণ প্রসাদ মল্লিক জানিয়েছেন, পাহাড়ী জনগোষ্ঠির বেশির ভাগ মানুষ জুম নির্ভর। জুমের ফলন ভাল হলে পাহাড়ে খাদ্য ঘাটতি দেখা যায় না।

এ কৃষি কর্মকর্তা আরও জানান, বৈজ্ঞানিত পদ্ধতিতে যদি জুম চাষ করা যায় তাহলে অধিক ফলন উৎপাদানের ফলে জুমিয়ারা যেমন লাভবান হবে ঠিক অন্যদিকে অধিক ফলন উৎপাদানের ফলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এসব ফসল বিক্রি করা যাবে। এছাড়া একই জমিতে সারা বছর চাষাবাদ করতে পারলে জুমিয়াদের আত্মসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে বলে যোগ করেন কৃষি কর্মকর্তা।

এ ব্যাপারে রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক পবন কুমার চাকমা জানিয়েছেন, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত হওয়ায় জুমের ফসল ভাল হয়েছে। এ বছর ধানের পাশাপাশি অন্যান্য সাথী ফসলের উৎপাদন সন্তোষজনক বলে জানান এ কৃষি কর্মকর্তা।

কৃষি কর্মকর্তা পবন বলেছেন, জুমিয়াদের যদি আমরা উচ্চ ফলনশীল ধানের সাথে পরিচয় ঘটাতে পারি তাহলে তারা আরও ভাল ফলন ঘরে তুলতে পারবে।

ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষি বিভাগ জুমিয়াদের নিয়ে কাজ করছে বলে যোগ করেন এ কৃষি কর্মকর্তা।