॥ আবু নাছের, বাঘাইছড়ি ॥

রাধুঁনীদের জন্য বিভিন্ন চূলা তৈরি করা হলেও এবার তাদের কথা মাথায় রেখে এবং তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় “আখাচূলা ” নামের একটি চূলা তৈরি করা হয়েছে। এ চূলার মূল বৈশিষ্ট হলো- একদিকে যেমন জ্বালানী লাগে কম তাই জ্বালানী খরচ বাচে ঠিক অন্যদিকে রাধুঁনীরা পাবে স্বাস্থ্য সুরক্ষা। চূলাটি থেকে ধোঁয়া সৃষ্টি না হওয়ায় রাধঁনীরা বেশ আরামে রান্নার কাজটা সুচারু ভাবে শেষ করতে পারবে।

তাই ধনী-গরীব সকল রাধুঁনী চাইলে এ চূলাটি অনায়েসেই ব্যবহার করতে পারবে। ও আহ আরেকটি কথা বলা দরকার। চূলার ছাইটি কিন্তু ফেলে দেবেন না। এ ছাই ব্যবহার করা যাবে আপনার সবজি ক্ষেতে। ফলে ফসল পাবেন ভাল। ছাইটিকে বলা হচ্ছে “বায়োচার”। তাই বাগানে অধিক ফসল উৎপাদনে বিকল্প সার হিসেবে চূলাটি থেকে উৎপাদিত ছাইটিকে ব্যবহার করতে পারবেন।

জানা গেছে- বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম মানিকগঞ্জ জেলায় এ চূলা তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলিয়ান উইন্টার নামের এক শিক্ষক এবং বাংলাদেশ খ্রিষ্টান ফর ডেভেলপমেন্ট এর যৌথ উদ্যোগে এ চূলা তৈরির প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। সংস্থাটির মূল উদ্দেশ্য হলো- বাংলাদেশের তৃণমূল দারিদ্র মানুষের জ্বালানি খরচ বাচানো এবং পরিবেশকে দূষণ মুক্ত রাখা। তাই তারা মানিকগঞ্জে এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

এদিকে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাদিম সারওয়ার জানতে পারে মানিকগঞ্জ জেলায় জ্বালানী সাশ্রয়ী চূলা উৎপাদন করা হচ্ছে। তাই তিনি আর দেরি না করে এ উপজেলার মানুষের কথা চিন্তা করে তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে উপজেলার কৃষি ব্লক সুপারভাইজার বদি আলমকে প্রধান করে চার সদস্যর একটি দলকে মানিকগঞ্জে প্রেরণ করে চূলা তৈরির প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্য। অবশেষে এ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত দলটি সফল ভাবে প্রশিক্ষণ শেষে বাঘাইছড়ি উপজেলায় ফিরে এসে নিজেরা জ্বালানী সাশ্রয়ী আখাচূলা তৈরি করেছে এবং সে চূলায় রান্না শুরু করেছে।

এবার ইউএনও নাদিমের লক্ষ্য পুরো উপজেলার প্রান্তিক দারিদ্র জনগোষ্ঠির রাঁধুনীদের মাঝে স্বাস্থ্য-সন্মত আখা চূলাটি ছড়িয়ে দেওয়া। সেই লক্ষে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।

  • Facebook
  • Twitter
  • Print Friendly

বাঘাইছড়ি উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান হিল রিপোর্টকে জানান- আখাচূলায় লাকড়ি ব্যবহার করে বায়োচার উৎপাদন করা হয়ে থাকে। এটি ব্যবহারে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও অনুজীবের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। মাটির জৈব গুণাগুণ বাড়িয়ে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে।

বায়োচার প্রজেক্টের টিম লিডার কৃষি ব্লক সুপারভাইজার বদি আলম হিল রিপোর্টকে জানান- প্রচলিত চুলায় বেশি খড়ির প্রয়োজন হয় । কিন্তু ‘আখা’য় খড়ি কম লাগে ও ধোঁয়া হয় না। রান্নায় কম সময় লাগে ও সবসময় চুলার পাড়ে বসে থাকতে হয় না। এ চুলা ব্যবহারে ধোঁয়াজনিত রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এ বিষয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাদিম সারোয়ার হিল রিপোর্টকে জানান-  দৈনন্দিন গৃহস্থালির রান্নার কাজে জ্বালানি একটি প্রধান সমস্যা। বাঘাইছড়ি উপজেলায়  জ্বালানী সমস্যা বেড়েই চলেছে। রান্নার কাজে সিলিন্ডার গ্যাস কিছুটা প্রয়োজন মেটাতে পারলেও সিংহভাগ জনগণের রান্নার জ্বালানির চাহিদা মেটাতে হয় কাঠ বা খড়ি দিয়ে। আর এতে করে অর্থ ও সময় দুটোই নষ্ট হয়।

আর এই আখাচূলা ব্যবহার করলে কাঠের ওপর চাপ কমিয়ে জ্বালানি সাশ্রয়সহ জৈব সারের ঘাটতি লাঘবে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে।

আধুনিক রান্নাঘরে অনায়াসেই অল্প পরিমাণে জ্বালানি কাঠ দিয়ে রান্নাবান্নার কাজ করা যায় এবং ধোঁয়ামুক্ত পরিবেশে গৃহিণীরা রান্নার কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। রান্না শেষে যে বায়োচার হবে সেগুলো বিক্রি করে বা নিজেদের ফসলি ক্ষেতে ব্যাবহার করে অধিক লাভবান হতে পারে তিনি জানান।

ইউএনও আরো বলেন- আমি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দিয়েছে বিভিন্ন কৃষক মাঠ দিবসে কৃষকদেরকে বাড়িতে রান্নার জন্য আখাচূলা ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ও ফসলি জমিতে বায়োচার ব্যবহারে উৎসাহিত করার জন্য কাজ করতে।

প্রসঙ্গত: বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদিম সারওয়ার বাঘাইছড়িতে যোগদান করার পর থেকে প্রান্তিক মানুষের জীবন মান উন্নয়নের জন্য ব্যাপক প্রসংশিত হয়েছেন। যেমন: যুবকদেরে ঘরের ভিতরে ড্রামে বা হাউজে মাছ চাষের প্রশিক্ষণ, বাঘাইছড়ির সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র -ছাত্রীদের মাঝে উন্নত পদ্ধতিতে অল্প জায়গায় ব্যাগ গার্ডেনিং এর মাধ্যমে অধিক ফসল উৎপাদন, এবং ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের জন্য মাষরুম চাষের প্রশিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণ শেষে ভিক্ষুকদের প্রত্যেক পরিবারকে একটি সরকারি খরচে মাশরুম সেন্টার তৈরি করার জন্য বীজ প্রদান করেন।