মঈন উদ্দীন বাপ্পী । হিলরিপোর্ট

রাঙামাটি: জুমের সোনালী পাকা ধানে ছেয়ে গেছে রাঙামাটির পাহাড়। শুরু হয়েছে ধান কাটার মহাউৎসব। জুম চাষীদের চোখেমুখে এখন আনন্দের ফোয়ারা বইছে। পাকা ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছে জুমিয়ারা। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের প্রধান পেশা হচ্ছে কৃষি।

রাঙামাটি সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়নের বিলাইছড়ি পাড়ার বাসিন্দা জুমচাষী সুমিত্রা চাকমা বলেন, দুই একর জমিতে আমি সাত কেজি তুর্কি ধান লাগিয়েছি। ফসল এখনো কাটেনি। কিছুদিন পর কাটবো।

তিনি আরও বলেন, আমি বরকল উপজেলায় গেলে আমার এক আত্মীয় ভারতের মিজোরাম থেকে আনা তুর্কি ধানের বীজ উপহার দেয়। এগুলো এনে জমিতে লাগিয়েছি। জানতে পেরেছি জাতটির ধান অত্যন্ত ভাল এবং ফসল ভার উৎপন্ন হয়।

একই এলাকার জুমচাষী বসু দেব চাকমা বাংলানিউজকে বলেন, আমি অন্যান্য ফসলের সাথে এইবার তিন একর জায়গায় ভারতীয় তুর্কি ধান রোপন করেছি। আশা করছি ভাল ফসল পাবো। পাশাপাশি মরিচ, করলা, বরবটি, ঝিংগা. চিচিংগা, চাল কুমড়া, কাকরোল লাগিয়েছি।

সুরেশ দেবী চাকমা বলেন, আমি ছুড়ি ধান রোপনের পাশাপাশি দুই একর জমিতে নতুন জাত তুর্কি ধান রোপন করেছি। এটা ভারতীয় জাত। ভাল ফলন হয়। তাই পাশ^বর্তীদের থেকে বীজ নিয়ে আমার জমিতে লাগিয়েছি। ছুড়ি ধান কাটা শুরু করেছি। এরপর তুর্কি ধান কাটা শুরু করবো।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাঙামাটি কার্যালয় থেকে জানা গেছে, জুমে নানাবিধ ফসল চাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে- স্থানীয় এবং উফশী জাতের ধান, মিষ্টি কুমড়া, মারফা, চিনাল, শিম, শসা, করলা, ঢেঁড়শ, তিল, ভুট্টা, মরিচ, কাউন, বিলাতী ধনিয়া, করলা, বরবটি, ঝিংগা. চিচিংগা, চাল কুমড়া, কাকরোল, পুঁইশাক, জুমকচু, মুখিকচু, বেগুন, লাউ. ধুন্দল, আদা, হলুদ, যব, তুলা, পাহাড়ি আলু যা ঠান্ডা আলু হিসাবে পরিচিত, ইত্যাদি।

সূত্রটি আরও জানায়- জুম চাষের পদ্ধতিও ভিন্ন রকম। পৌষ-মাঘ মাসে সুবিধাজনক সময়ে চাষের জন্য এক টুকরো পাহাড় নির্বাচন করা হয়। তারপর জঙ্গলের সমস্ত গাছ, বাশঁ, ঝাড়-জঙ্গল কেটে ফেলা হয়। কাটার পর সেগুলো রোদে শুকানো হয় চৈত্র মাস পর্যন্ত। চৈত্র ও বৈশাখের শুরুতে এতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। তাতে শুকিয়ে যাওয়া গাছপালা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেইসঙ্গে ওপরের ১-২ ইঞ্চি মাটিও পুড়ে যায়। ছাই ও পোড়া মাটির জন্য জমি উর্বর হয়। এরপর দু-এক পশলা বৃষ্টি হলে জমি ভিজে নরম হয়। তারপর বীজ বোনার কাজ শুরু হয়।

সূত্রটি বলছে, রাঙামাটি জেলায় এ বছর পাঁচ হাজার ৫৮০ হেক্টর পাহাড়ে জুম ধান (উফশী) চাষ করা হয়েছে। এবারের আবহাওয়া অনুকলে থাকায় ও সঠিক বৃষ্টিপাতের কারণে এবার জুমের ফলন ভালো হয়েছে। জুম ধানের মধ্যে দেশীয় বিরিধান ২৪,২৬,২৭,৪৮ জাতের ধান চাষ করা হয়েছে। পাশাপাশি কালবিনি, সাদাবিনি, গেলং, কবারক, আমেই, বাদোয়ে, বিনি ধান জাতের চাষ হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাঙামাটি অঞ্চলের উপ-পরিচালক কৃষ্ণ প্রসাদ মল্লিক বলেন, গত বছরের তুলনায় এই মৌসুমে জুমের ভাল ফলন হয়েছে। জুম চাষীদের স্থানীয় বীজের পাশাপাশি খড়া সহিষ্ণু ফলনশীল বিরি ধান- ২৪,২৬,২৭,৪৮ জাতের চাষ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জুম চাষ এক প্রকার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হলেও পাহাড়িদের জন্য এ চাষের কোন বিকল্প নেই। কারণ এটি পাহাড়িদের ঐতিহ্য বহন করে। এইজন্য পাহাড়ের ভূমি ক্ষয়রোধে জুম চাষীদেরকে পাহাড় আড়াআড়ি কেটে চাষ করতে বলা হচ্ছে।

কৃষি কর্মকর্তা কৃষ্ণ প্রসাদ মল্লিক বলেন, রাজস্থলী উপজেলার কাপ্তাই মৌজা, কমলছড়ি এলাকা, চিংকং মৌজা, জুরাছড়ি উপজেলার মৈদং,বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক এলাকায় জুম চাষ ছাড়া কোন বিকল্প নেই।