॥ নুরুল কবির ॥

সকালের দিকে হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। এরপরও মাটি কাটা চলছিল। মাছের প্রজেক্টের জন্য পাহাড়ের মাটি কেটে ড্রেন তৈরি কাজ চলছিল। ড্রেনের গভীরতা প্রায় ২৫ ফুট। একসময় উপর থেকে মাটি ভেঙ্গে পাস করে আঁছড়ে পড়ল নিচে থাকা শ্রমিকদের গায়ে।

ঐ সময়ে স্থানীয় পাঁচজন শ্রমিক মাটি কাটা কাজে নিয়োজিত ছিল। কিছু বুঝে উঠার আগে ঘটনাস্থলেই মাটি চাপা পড়ে প্রাণ গেল  চার শ্রমিকের। স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌছে একজনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। তাকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার (২১ মে) সকাল এগারটার দিকে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুনধুম ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের বড়ইতলী গ্রামে। পাহাড় কাটার সময় মাটি চাপা পড়ে চার শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

মাটি চাপা পড়া নিহত শ্রমিকদের লাশ উদ্ধার কাজে সহযোগিতা করছে স্থানীয় লোকজন, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা। ড্রেনটি গভীর হওয়ার কারণে স্ক্যাবেটর দিয়ে মাটি সরানোর কাজ চলছে।

ড্রেনটি গভীর হওয়ার দরুণ মাটি সরাতে বেগ পেতে হচ্ছে উদ্ধারকর্মীদের। নিহত শ্রমিকদের সবার বাড়ি নাইক্ষ্যংছড়ির বড়ইতলী গ্রামে। পাহাড় কাটার মূলহোতা সুপায়ন বড়–য়া ঘটনার পর থেকে গা ঢাকা দিয়েছে। তাঁর বাড়ি কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার ভালুক্ক্যা এলাকায়।

মাছের প্রজেক্টের জন্য ড্রেন তৈরিতে মাটি কাটা হলেও মূলত পাহাড় কাটাই হচ্ছে। পাহাড় কেটে গভীরভাবে ড্রেন বানানো হচ্ছে। মূলত পাহাড় কাটার কারণেই মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম আসলেই পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হয়। পাহাড় কেটে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপনে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।

বর্ষা মৌসুম আসলেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়। এই মাইকিং করে সর্তক করে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে প্রশাসন। এরপর পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতিকারীদের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। পাহাড় কাটার ব্যাপারেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই বললেই চলে।

গত বছর তিন পার্বত্য জেলায় ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। জেলা ত্রাণ ও পূণর্বাসন শাখার দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, বান্দরবান জেলায় ২০১২ সালে পাহাড় ধসে মারা গেছে ৩৭ জন। ২০১৫ সালে ৯ জন। গত বছর ২০১৭ সালের জুন ও জুলাই মাসে একই পরিবারের তিন শিশুসহ ৭ জন। ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের জুলাই পর্যন্ত পাহাড় ধসে মারা গেছে ৫৩ জন। জেলায় বর্তমানে কত পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে তার হিসাব জেলা প্রশাসনের কাছে নেই।

এই ব্যাপারে কোনো জরিপও হয়নি। তবে বেসরকারিভাবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে জেলায় প্রায় ৫০ হাজার পরিবার পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে।

সোমবার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের মিয়ানমার সীমান্তবর্তী মনজয় পাড়ার ৯নং ওয়ার্ডের বড়ইতলী গ্রামে পাহাড় কেটে ড্রেন তৈরি সময় মাটি চাপা পড়ে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন, মনজয় পাড়ার মোহাম্মদ সুলতানের ছেলে আবু আহমেদ (২৮), শাহ আলমের ছেলে মো. জসিম (২৫), মৃত আবদুস শুক্কুরের ছেলে নুরুল হাকিম (২৫) ও সোনা মেহের (৩৩)।

নাইক্ষংছড়িতে মাটি চাপা পড়া নিহতদের প্রতি গভীর শোক ও পরিবার পরিজনের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন পাবত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর এমপি,বান্দরবান পাবত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা,জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ও পৌর মেয়র মোহাম্মদ ইমলাম বেবী !

ঘুমধুম ইউনিয়ন চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ঘুমধুম ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের বড়ইতলী গ্রামে সুপায়ন বড়–য়ার নিয়োগকৃত শ্রমিকেরা পাহাড় কাটার সময় মাটি চাপা পড়ে ৪ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরোয়ার কামাল জানান, পাহাড় কাটার সময় ৫ জন শ্রমিক মাটি চাপা পড়ার খবর পেয়েছি। ঘটনাস্থলে উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে প্রশাসন ও স্থানীয়রা। ঘটনাস্থল থেকে একজনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো: আসলাম হোসেন জানান, পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের তালিকা এখনো সম্পূর্ণভাবে হাতে এসে পৌছায়নি। শিঘ্রই চলে আসবে। ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের ব্যাপারে সরকারের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে লোকজনদের সব সময় সতর্ক করে দেওয়া হয়। আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়।