হিলরিপোর্ট ডেস্ক

রাঙামাটি: হযরত গাউছুল আযম মওলানা শাহসূফী সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবা ভাণ্ডারী (কঃ) এর তৃতীয় শাহজাদা গাউছে দাওরান হযরত মওলানা শাহসূফী সৈয়দ মাহবুবুল বশর মাইজভাণ্ডারী (কঃ) এর ঔরসজাত জ্যেষ্ঠ শাহজাদা হলেন গাউছে জমান মওলানা শাহসূফী সৈয়দ বদরুদ্দোজা মাইজভাণ্ডারী (কঃ)। তাঁর আম্মাজানের নাম রওশন আরা বেগম। এ মহান মনিষী ১২ ই ফাল্গুন, ১৩৪৫ বাংলা, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৯ ইং সালে মাইজভাণ্ডার শরীফে তশরীফ আনেন।

গাউছুল আযম হযরত কেবলা (কঃ) ও গাউছুল আযম হযরত বাবা ভাণ্ডারী কেবলা (কঃ) এর পরবর্তীতে মাইজভাণ্ডার শরীফে তিনি অন্যতম আলেমে দ্বীন আওলাদে পাক। তিনি একদিকে যেমন ছিলেন শরীয়তের আলেম, তেমনি অন্যদিকে ছিলেন গাউছুল আযম হযরত বাবা ভাণ্ডারী কেবলা (কঃ) এর রুহানী বায়াত ও ফয়েজপ্রাপ্ত।

বাল্যকাল হতেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পিতাকে হারানোর পরও ফাজিল ও বি. কম পাশ করে তিনি শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেন। শিক্ষাজীবনের এক প্রান্তে লন্ডন হতে কস্ট একাউন্টেন্সিতে সম্পূর্ণ স্কলারশীপ পাওয়া সত্ত্বেও পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে পরিবারের দিকে তাকিয়ে তাতে অংশগ্রহণ করেন নি।

একজন সত্যিকার আলেমে দ্বীনের পরিচয় পাওয়া যেতো তার কথাবার্তা ও চলাফেরায়। শরীয়ত ও রাসূলে পাক (দঃ) এর সুন্নাহের গভীর অনুসরণ ছিলো তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। শরীয়ত ও সুন্নাহের বিপরীত কোন কাজ তিনি সহ্য করতেন না,তাঁর অনুসারীদের নামায আদায় ও জিকরের ব্যাপারে সবসময় সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করতেন।

নিজে ফরয আদায়ের পাশাপাশি নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। এছাড়া আইয়ামে বীযের রোজাও রাখতেন নিয়মিত। তিনি নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত তো করতেনই, রমজান মাসে দু থেকে তিনবার কুরআন খতমও করতেন। জ্ঞানার্জনের প্রতি ছিলো তাঁর গভীর আগ্রহ। অনেক দুর্লভ ইসলামী কিতাবের সংগ্রহ ছিলো তার কাছে।

যে কোন জ্ঞানপিপাসু ব্যক্তিদের সাথে তিনি কিতাব নিয়ে আলোচনায় দীর্ঘক্ষণ সময় অতিবাহিত করতেন। বিশেষ করে আলেমেদ্বীনদের তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং আলাদা মর্যাদা দিতেন। মাইজভাণ্ডার শরীফ জেয়ারতে আসলে বিশিষ্ট আলেমে দ্বীনগণ তাঁর সাথে সাক্ষাত না করে যেতেন না। তাঁর নরম ব্যবহার, মনোমুগ্ধকর হাসি, সুমধুর কণ্ঠস্বর ও মিষ্টি ভাষার উপদেশ যে কাউকে আকৃষ্ট করতো।

অনেক ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ কথা তিনি খুব সংক্ষেপে কিন্তু সহজ ভাষায় ব্যক্ত করতেন। তাঁর গঠনমূলক, যুক্তিনির্ভর, চিত্তাকর্ষক ও প্রাণসঞ্চারিণী ওয়াজ নসীহত দ্বারা অনেক পথহারা পেয়েছে সঠিক পথের সন্ধান।

ইসলামী গবেষণার কাজে তিনি নিজেকে প্রায়শই নিয়োজিত রাখতেন। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত গবেষণাধর্মী নিবন্ধ লেখার পাশাপাশি তিনি গাউছুল আযম হযরত বাবা ভাণ্ডারী (কঃ) এর জীবনীগ্রন্থ ‘অলীকুল শিরোমণি হযরত বাবা ভাণ্ডারী’, ‘মাইজভাণ্ডারী সওগাত’, বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধের সংকলনে গ্রন্থ ‘আল্লাহর অনুগ্রহের সন্ধানে’, সঠিকভাবে মিলাদ কিয়ামের দিক নির্দেশনা মূলক গ্রন্থ ‘দরুদ ও সালাম’ এবং মওলানা বজলুল করিম মন্দাকিনী সাহেবের মাইজভাণ্ডারী কালামের কিতাব ‘প্রেমের হেম’ সম্পাদনাপূর্বক প্রকাশ করেন।

তার এ প্রকাশনাগুলো যে কারো অনেক প্রশ্নের জবাব দেয়ার পাশাপাশি জ্ঞানপিপাসুদের তৃষ্ণা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গ্রন্থগুলোতে তার শব্দ চয়নের বিচক্ষণতা যে কাউকেই বিমোহিত করবে।

তিনি রীতিমত ভাষা নিয়েও যেন গবেষণা করতেন। তিনি ছিলেন বাংলা, ইংরেজী, আরবি, উর্দু ও ফারসী ভাষায় পারদর্শী একজন উচ্চমার্গের মুফতী ও আলেমেদ্বীন। ইসলামের সারবস্তু ‘তাসাউফ’ এর অনুসরণকারীদের জন্য তিনি একজন প্রকৃত অভিভাবক। তিনি ছিলেন একইসাথে সর্বজনের নিকট শ্রদ্ধেয় শরীয়তের পুরোধা ও অসংখ্য ভক্ত আশেকের কলব সংস্কারকারী তরিকতের অন্যতম দীক্ষাগুরু।

সর্বদা মানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ এ ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে কেউ খালি হাতে ফিরে যায় নি। বিভিন্ন মসজিদ,মাদ্রাসা ও এতিমখানার জন্য তিনি দান করতেন অকাতরে। সকলের কাছে তিনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় ও আদরণীয় ব্যক্তিত্ব।

গাউছুল আযম হযরত বাবা ভাণ্ডারী কেবলা হরিদ্রা রঙের যে চৌগাটি গাউছুল আযম হযরত কেবলা কর্তৃক প্রাপ্ত হয়েছেন; গাউছুল আযম হযরত বাবা ভাণ্ডারী কেবলা তার খাদেম মৌলভী শরাফত আলীকে (প্রকাশ লক্ষ্মীর বাপ) স্বপ্নের মাধ্যমে আদেশ প্রদান করে তাঁরই সুযোগ্য আওলাদ, গাউছে জমান হযরত মওলানা শাহসূফী সৈয়দ বদরুদ্দোজা মাইভাণ্ডারীর নিকট প্রেরণ করেছেন।

গাউছুল আযম হযরত শাহসূফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (কঃ) এবং গাউছুল আযম হযরত শাহসূফী সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবা ভাণ্ডারী (কঃ) এর প্রতি গাউছে জমান হযরত শাহসূফী সৈয়দ বদরুদ্দোজা মাইজভাণ্ডারীর ছিলো অগাধ টান, ভক্তি ও বিশ্বাস। নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে পছন্দ করে একজন আওলাদে রাসূল (দঃ), আওলাদে গাউছুল আযম ও এত বড় মাপের একজন আলেমে দ্বীন হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের নামের পূর্বে কখনো ‘খাদেমে আশেকান’ ; অর্থাৎ (মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে আগত গাউছুল আযম হযরত কেবলা ও গাউছুল আযম বাবা ভাণ্ডারী কেবলার আশেকগণের খাদেম) ছাড়া অন্য কোন লকব ব্যবহার করেন নি।

গাউছুল আযম হযরত কেবলা ও গাউছুল আযম বাবা ভাণ্ডারী কেবলার পরবর্তীতে মাইজভাণ্ডারী তরিকার এ অন্যতম দিকপাল লক্ষ আশেকানদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে আজকের এ দিনে গত ২৭ শে চৈত্র, ১৪২০ বাংলা; ১০ ই এপ্রিল ২০১৩ ইং, ৭৪ বছর বয়সে মহান রব্বুল আলামীনের সান্নিধ্যলাভে পর্দা করেন।

আল্লাহপাক রব্বুল আলামীন আমাদের তাঁর ফয়েজ,রহমত হাসিলের তৌফিক দান করুন। আমীন