॥ মঈন উদ্দীন বাপ্পী ॥

বীর মুক্তিযোদ্ধা পেয়ারার পরিচিতি:

পুরো নাম শামসুদ্দীন মোহাম্মদ পেয়ারা। বাবার চাকরী সূত্রে রাঙামাটিতে তার জন্ম হয়েছে। লেখা-পড়া করেছেন জেলার সবচেয়ে পুরোনো স্কুল রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। এরপর জেলার বাইরে উচ্চ মাধ্যমিক পরবর্তী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখা-পড়া করেছেন। বর্তমানে তিনি পেশায় একজন সুনামধন্য সাংবাদিক। কর্মের কারণে রাজধানীতে বসবাস করছেন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি চারণ করতে তার জন্মভূমি রাঙামাটিতে আসলে তিনি এ স্বাক্ষাৎকার প্রদান করেন।

রাঙামাটিতে যুদ্ধকালীন তার নানান স্মৃতি:

বীর এ মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধকালীন স্মৃতি রোমান্থন করতে গিয়ে বারবার আবেগে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। চোখের পানিতে চশমাটা ভিজে যাচ্ছিলো দেশের এ বীর মুক্তিযোদ্ধার।

মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা জানতে চাইলে আবেগী কন্ঠে বলেন, বয়স অনেক হয়েছে। অনেক কিছু দেখা হয়েছে। যে দেশের স্বপ্ন দেখে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছি বর্তমানে সে স্বপ্নের দেশ খুঁজি পাচ্ছি না। পরবর্তী প্রজন্মকে কি দিয়ে যতে পারবো তা জানি না। ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে বারংবার।

দেশদ্রোহীরা দেশের ক্ষতি করতে এখনো সক্রিয়। আমরা এখনো পূর্ণাঙ্গ ভাবে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। এখনো দেশদ্রোহীরা বুক ফুলিয়ে দেশের বিরুদ্ধে নানা প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে।

বীর এ যোদ্ধা বলেন, দেশকে ভালবেসে সাংবাদিকতা পেশাকে বেচে নিয়েছি। একটু নি:শ্বাস, অপলক দৃষ্টিতে বলতে লাগলেন, সেই দিন ঘন কুয়াশা ছিলো না, শীতের প্রখরতা সেদিন ছিলো না। এখনো মনে হয় এসএলআর নিয়ে ঠাঁই দাড়িয়ে আছি শত্রুকে ধ্বংস করবো বলে। কিন্তু সময় বসে নেই, পার হয়ে গেছে দীর্ঘ ৪৭ বছর।

বলতে লাগলেন তিনি, বিএলএফ এর হয়ে কয়েকশো যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার জন্য ভারতের প্রদেশ মিজোরামের দেমাগ্রী গেছি ট্রেনিং করার জন্য। আর এ ট্রেনিংয়ে পরিচয় হয় রাঙামাটি আরেক কৃতি সন্তান রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ছাত্র মনীষ দেওয়ানের সাথে।

তৎকালীন বিএলএফ এর নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শেখ ফজলুল হক মণি এবং এ সংগঠনের কমান্ডার ছিলেন, ভারতীয় জেনারেল সুজান সিং উবান। আর সুজান সিংয়ের নেতৃত্বে এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলেছিলো।

কয়েকমাস প্রশিক্ষণ শেষে ভারত হয়ে রাঙামাটি আক্রমণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এ বীর মুক্তিযুদ্ধা জানান, সীমান্ত অতিক্রম করে ৮-১০মাইল কয়েকবার পথব্রজ করে রাঙামাটিতে আসলেও কমান্ডার সুজান সিং উবানের নির্দেশে প্রথম হেলিকপ্টারে করে রাঙামাটিতে আসেন ১৯৭১ সালের ১৫ডিসেম্বর পাকিস্তানী সেনাদের সাথে যুদ্ধ করতে।
১৫ ডিসেম্বর যখন মেজর সুরীসহ হেলিকপ্টারে করে ভারতের দেমাগ্রী হয়ে রাঙামাটির উদ্দেশ্য রওনা হলাম সকাল সাড়ে ৯টায়।

তিনি বলেন, রাঙামাটিতে পৌছার পর আমাদের হেলিকপ্টারে পাকিস্তানী বাহিনীর গুলি বর্ষন করলে হেলিকপ্টারটি আক্রান্ত হয়। কিন্তু তারপরও হেলিকপ্টার আমাদের কুতুকছড়িতে নামিয়ে দিয়ে আরও সৈন্য আনতে চলে গেল। তথক্ষণে পকিস্তানী বাহিনী কুতুকছড়িতে প্রবেশ করলো। সেদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে আমাদের লড়াই হলো। সন্ধ্যার পর যুদ্ধ থামলো।

১৬ ডিসেম্বর সকালে কুয়াশার জন্য কিছু দেখা যাচ্ছে না। মেজর সুরী ও আমরা যখন পরিস্থিতি দেখার জন্য বের হলাম তখনি আবার পাকিস্তানী বাহিনীর গুলি বর্ষণ করতে লাগলো। দিন পেরিয়ে বিকেলে আমি আর বন্ধু কর্ণেল মণীষ দেওয়ান কাউখালীর উদ্দেশ্য পুরোমন পাহাড় পাড়ি দিয়েছি। পাহাড়ে চাকমাদের ঘরে রাত কাটিয়েছি।

১৭ ডিসেম্বর সকালে কাউখালীতে পৌছলে সাধারণ মানুষেরা বলাবলি করছে রাজাকার, পাকিস্তানী বাহিনীরা পালিয়ে গেছে। আর সারাদেশ ১৬ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হলেও রাঙামাটি প্রথম হানাদার মুক্ত হয় ১৭ডিসেম্বর। সেদিন আমরাই প্রথম রাঙামাটির পুরাতন কোর্ট বিল্ডিং এলাকায় (বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এলাকা) দেশের স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করি।