মঈন উদ্দীন বাপ্পী । হিলরিপোর্ট

রাঙামাটি: বৈশাখ আসলে পাহাড় সাজে নব রূপে, নতুন আঙ্গিকে। নতুন করে গড়ে উঠে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে মিলনের মিতালী। এ যেন মানব সমাজের নব্য মিলন মেলা। কিন্তু বৈশ্বিক করোনা এইবার সেই উৎসবকে মাটি করে দিয়েছে।

পাহাড়ি পল্লীগুলোতে নেই কোন উৎসবের আমেজ। যে যার বাড়িতে অবস্থান করছে এবং পারিবারিক ভাবে অত্যন্ত সীমতি আকারে নিজেদের পরিবারে বৈসাবি পালন করছে। তবে সেই উৎসবে নেই কোন আনন্দ, নেই কোন উৎপল্ল, নেই কোন আনন্দ উৎসবের ভাগাভাগি। তাদের চোখে মুখে বেদনার ছাপ, দু:শ্চিন্তার ভয়।

পাহাড়-হ্রদ আর অরণ্যের শহর রাঙামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ে বর্ষবিদায় এবং বর্ষবরণের এ উৎসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টিদের প্রাণের উৎসব হিসেবে খ্যাতি রয়েছে। চাকমাদের ভাষায় এ উৎসবকে বিঝু, ত্রিপুরাদের ভাষায় বৈসুক এবং মারমাদের ভাষায় সাংগ্রাই এবং তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষায় বিসু এবং অহমিয়াদের ভাষায় বিহু নামে আখ্যায়িত করা হয়।তিন সম্প্রদায়ের প্রাণের এই উৎসবের নামের আদ্যক্ষর নিয়েই তাই এই মহান উৎসবকে বলা হয় ‘বৈসাবি’।

কিন্তু পাহাড়ে শুরু হওয়া তিনদিনের বৈসাবী উৎসবে এবার প্রাণহীন। পাহাড় জুড়ে সর্বত্র যেন আতংক বিরাজ করছে। সারা বিশ্বব্যাপী মরনঘাতী করোনা ভাইরাসের কারনে পাহাড়ের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষের মাঝে এবার বৈসাবি উৎসবের পালনের তেমন কোন প্রস্তুতি নেই বললেই চলে। বিগত বছরগুলোতে পাহাড়ের সাধারন মানুষেরা এ উৎসব শুরু হওয়ার প্রায় দশ থেকে পনের দিন আগে থেকে যেই উৎসাহ -উদ্দীপনা নিয়ে বৈসাবী পালনের জন্য প্রস্তুতি নিতো এইবার কিন্তু সেই আমেজটা করোনার কারনে ম্লান হয়ে গেছে।

তবুও মনে বিষন্নতার ছাপ নিয়ে রোববার ভোরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টিদের কেউ কেউ পানিতে ভুল ভাসিয়ে পারিবারিক রেওয়াজ অনুযায়ী উৎসবের শুভ সূচনা করেন।

জানা যায়, তিন দিনব্যাপী এই উৎসবের প্রথম দিনকে চাকমা ভাষায় ফুল বিঝু,দ্বিতীয় দিনকে ‘মূল বিঝু’ এবং তৃতীয় দিনকে ‘নুয়াবঝর’ বা ‘গোজ্যা পোজ্যা দিন’বলা হয়। এভাবেই ত্রিপুরারা প্রথম দিনকে ‘হারিকুইসুক’ দ্বিতীয় দিনকে ‘বুইসুকমা’ এবং তৃতীয় দিনকে ‘বিসিকাতাল’ নামে অভিহিত করে থাকে।

এ প্রসঙ্গে রাঙামাটি জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ চাকমা বলেন, এবারের বৈসাবি উৎসবে পাহাড়ের মানুষের মাঝে কোন আনন্দ নেই, নেই কোন সামাজিক আচার অনুষ্ঠান। এবছর শুধু আমরা নিজেদের পরিবার পরিজন নিয়ে ঘরে থেকেই কোনভাবে এ উৎসব পালন করছি।

সমাজ কর্মী অমর কুমার চাকমা বলেন, আমরা বিঝু পালনের জন্য পনের দিন আগে থেকে আমাদের গ্রামগুলোকে সাজিয়ে তুলি। আয়োজন করি নানা সামাজিক অনুষ্ঠানের। সমাজের বয়ো:জৈষ্টদের গোসল করানো, বস্ত্রদান, পিঠা উৎসব, পাঁজন রান্না, খেলা-ধূলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নানা আয়োজন। কিন্তু এইবারের বৈশ্বিক করোনা আমাদের সেই উৎসবকে শেষ করে দিয়েছে। যদি বেচি থাকি তাহলে আগামি বছর আড়ম্বও আয়োজনের মধ্যে আমরা উৎসব পালন করবো।

রাঙামাটি ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ঝিনুক ত্রিপুরা বলেন, আমরা এবার প্রাণহীন বৈসুক পালন করছি। সবাই ব্যাক্তিগতভাবে সকালে সীমিত পরিসরে ফুল ভাসিয়েছে মা গঙ্গার উদ্দেশ্যে। তিনি আরো বলেন, আমরা প্রতিবছর ঘরে ঘরে যে পাঁজন রান্না করি করোনা ভাইরাসের কারনে ঐ পাঁজনের সব তরকারীও বাজারে পাওয়া যায়নি। তাই হাতের কাছে যা পেয়েছি তাই দিয়ে কোনরকমে দিনটি পালন করছি।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম পার্বত্যাঞ্চল শাখার সদস্য সচিব ইন্টু মণি তালুকদার বলেন, এবারও আমরা পাহাড়ের বৈসাবি উৎসব পালনের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলাম কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারনে এবং সরকারীভাবে সকল ধরনের অনুষ্ঠান বাতিলের প্রজ্ঞাপনের পর আমরা আমাদের বৈসািব উৎসবের অনুষ্ঠান বাতিল করেছি।