॥ মো. ওমর ফারুক ॥

রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের অত্যন্ত প্রত্যন্ত এলাকা মিতিঙ্গাছড়ি পাহাড়ী  গ্রাম। এই গ্রামে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মিতিঙ্গাছড়ি নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়।  জানা যায়, কাউখালী উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ৩নং ঘাগড়া ইউনিয়নের ১০টি পাড়া নিয়ে ১হাজার পরিবাররের বসবাস।

একটি জনবহুল প্রত্যন্ত এলাকা এই মিতিঙ্গাছড়ি পাহাড়ী গ্রাম। যে গ্রামে রয়েছে চাকমা,মারমা,তঞ্চঙ্গ্যাসহ প্রায় ৬-৭ হাজার লোকের বসবাস। শুধুমাত্র একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে এই পাহাড়ী গ্রামটিতে। কিন্তু এই গ্রামের কোমলমতি শিশুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকালেও মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য ইতিপুর্বে ছিলনা এই গ্রামে কোন নি¤œ-মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

ফলে ৫ম শ্রেণীর পর এখানকার ছেলে মেয়েদের পড়ালেখার ভাগ্য এখানে শেষ হতো। কারন এই গ্রাম হতে কাউখালী উপজেলা সদর প্রায় ৭কিলোমিটার, অপরদিকে রাঙুনীয়ার রানীরহাট বাজার প্রায় ৮ কিলোমিটার, ঘাগড়া বাজার প্রায় ৯কিলোমিটার। কিন্তু এত দুরুত্বের কারনে অন্যদিকে আর্থিক অস্বচ্চলতার কারনে মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পড়ালেখা করা ছিল এই গ্রামের ছেলে মেয়েদের দুঃস্বপ্ন।

কিন্তু এলাকার কিছু উদ্যোগি যুবক ও এলাকার সাধারন মানুষের সহযোগিতায় ২০১৪ সালে কাউখালী উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস-চেয়ারম্যান অর্জুনমনি চাকমার নেতৃত্বে গড়ে তোলেন একটি ছোট পাহাড়ের উপর মিতিংগাছড়ি নি¤œ-মাধ্যমিক বিদ্যালয়। শুধুমাত্র একটি আধা সেমি পাকা ৪কক্ষের ঘর। এই বিদ্যালয়ে শুরু করেন ৬ষ্ঠ শ্রেনী-৮ম শ্রেনীর পাঠদান।

স্ব-ই”্ছায় এই গ্রামের এবং পার্শ্ববতী গ্রামের শিক্ষিত বেশ কিছু পাহাড়ী শিক্ষক-শিক্ষিকা শুরু করেন পাঠদান কার্যক্রম। বর্তমানে বিদ্যালয়ে ১২ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা স্বেচ্ছায় পাঠদান করে চলেছেন। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৫০ জনের মতো ছাত্র-ছাত্রী অধ্যায়নরত রয়েছে বলে জানা যায়।

উপজেলা সদর হতে ৭ কিলোমিটার দুরে প্রত্যন্ত এই পাহাড়ী গ্রাম সরেজমিনে পরিদর্শনকালে দেখা যায়,-শুনশান নিরবতা চারদিকে ছোট বড় পাহাড় আর প্রাকৃতিক সাজে সজ্জিত এই গ্রাম। গ্রামের সাধারন মানুষেরা যে যার মতো করে ক্ষেতে পাহাড়ে নিজ কাজে ব্যাস্ত। কথা হয় এই গ্রামের বয়স্ক লোক পদ্ম কুমার চাকমা, বিমল চাকমা, কালাম তনচংগা, রাজ্যমনি তনচংগা’র সাথে তারা সকলেই এক বাক্যে বলেন আমাদের এই গ্রামটি যদিওবা কাউখালী উপজেলা অর্ন্তগত কিন্তু উপজেলা সদর হতে অনেক দুরে অপরদিকে ঘাগড়া এবং রানীরহাট তাও আবার অনেক দুরে কি করে আমাদের ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা করাবো সেই চিন্তায় আমরা গ্রামের সাধারন মানুষেরা অস্থির ছিলাম।

কিন্তু ২০১৪ সালে মিতিঙ্গাছড়ি নি¤œমাধ্যমিক এই বিদ্যালয়টি হওয়ার কারনে আজ আমাদের এই প্রত্যন্ত পাহাড়ী গ্রামের ১০ পাড়ার ছেলে মেয়েরা পড়ালেখার সুযোগ পেলো। নয়তো এই গ্রামের ছেলে মেয়েরা শিক্ষায় অনেক পিছনে পড়ে থাকতো। কথা হয় বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি তপন তালুকদার লক্ষি’র সাথে তিনি বলেন, এই বিদ্যালয়ের জন্য এই এলাকার মানুষের সহযোগিতায় ১একর ৫শতক জমি রেজিঃমুলে খরিদ করি। খাস জমি রয়েছে প্রায় ২একর পাহাড়। সম্পুর্ন নিজদের সার্বিক সহযোগিতায় এবং পরিশ্রমে এই প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমরা মিতিংগাছড়ি ১০ পাড়ার সাধারন লোকজন এই বিদ্যালয়টি চালিয়ে আসতেছি। কিন্তু সরকার হতে এখনো কোন সহযোগিতা পাইনি। বর্তমানে বিদ্যালয়ের নতুন ভবন,ফার্নিচার,টয়লেট খুবই প্রযোজন।

বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন মিতিংঘাছড়ি নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহেন কুমার সাথে তিনি বলেন, দির্ঘদিন যাবত এই বিদ্যালয়ে শ্রম দিয়ে আসতেছি শুধু এই পাহাড়ী প্রত্যন্ত এলাকার ছেলে মেয়েদের একটু শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে। কারন এলাকাটি এমন জায়গায় যা মনে হয় কারো চোখে পড়ার মতো নয়। শুধুমাত্র যদি কোন লোকজন এই এলাকায় কোন কাজে কর্মে আসেন তাহলে হয়তোবা এই গ্রামের পাড়া গুলি চোখে পড়বে।

একদিকে বিদ্যালয়টি এলাকাবাসির সহযোগিতায় চলে অন্যদিকে সরকার হতে আমরা কোন সহযোগিতা পাইনি এখন পর্যন্ত এমপিও ভুক্ত হয়নি এই বিদ্যালয়টি। শত বাধাঁ পেরিয়ে আমরা বিদ্যালয়টির সকল কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে গত রোববার উক্ত বিদ্যালয়ে কাউখালী উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এ্যানি চাকমা কৃপার সহযোগিতায় সরকার হতে এই বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিনামুল্যে ৫৫সেট পাঠ্য বিতরন করা হয়। পাঠ্যবই বিতরণ উপলক্ষে এক আলোচনা বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি তপন চাকমা লক্ষি’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন কাউখালী উপজেলা পরিষদ মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান এ্যানি চাকমা কৃপা।

অনুষ্ঠানে বিষেশ অতিথি ছিলেন উপজেলা পরিষদ ভাইস-চেয়ারম্যান মংসুইউ চৌধুরী ডুমং, উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস-চেয়ারম্যান অর্জনমুনি চাকমা, কাউখালী প্রেস ক্লাবের সহ- সভাপতি মোঃ ওমর ফারুক, ৩নং ঘাগড়া ইউপি’ চেয়ারম্যান মাষ্টার জগদীশ চাকমা, মেম্বার বিপর্ষি তঞ্চাঙ্গ্যা প্রমুখ।অনুষ্টান সঞ্চালনায় ছিলেন মাষ্টার সুনিল কান্তি চাকমা।

বিনা মুল্যে পাঠ্য পুস্তক বিতরন উপলক্ষে এলাকার স্থানীয় লোকজন, অভিভাবক, গন্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ, বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী গন এ সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলের একটাই দাবী বর্তমান সরকারের কাছে, বর্তমান সরকার জনবান্ধব সরকার। শিক্ষার উপর সরকারের বিশেষ গুরুত্ব প্রদান সেহুতু রাঙামাটি পার্বত্য জেলার কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এই পাহাড়ী জনপদের মিতিংগাছড়ি নি¤œ-মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির সার্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে যেন এই বিদ্যালয়টি সরকারী এমপিওভুক্ত করন এবং গরীব অসহায় ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখার জন্য সরকারী সকল সুযোগ সুবিদা প্রদানের জন্য সকলের একমাত্র প্রানের দাবী বলে জানান।