॥ মঈন উদ্দীন বাপ্পী ॥

বিগত বছর ২০১৭ শেষ হয়েছে একের পর এক হত্যাকান্ড দিয়ে। ওই সময় স্থানীয় আ’লীগের নেতাদের উপর হত্যাকান্ড চালিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি (পিসিজেএসএস) এমনটা অভিযোগ আ’লীগের।

এবার ২০১৮ শুরু হয়েছে খুন, গুম এবং হত্যাযজ্ঞ দিয়ে। নতুন বছরের শুরু থেকে শান্ত পাহাড় আবারো অশান্ত হয়ে উঠেছে। বুলেটের আঘাতে পাহাড়ে তরতাজা রক্তের গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে। এ যেন দেখার কেউ নেই। পাহাড়ে প্রতিনিয়ত বুলেটের আঘাত বিষবাষ্পে পরিণত হয়েছে।

প্রতিদিন একের পর এক পাহাড়ে লাশ পরছে। মা হারাচ্ছে তার সন্তাকে, স্ত্রী হারাচ্ছে স্বামী, সন্তান হারাচ্ছে তা পিতাকে। অনেকের মরদেহ পাওয়া যাচ্ছে না। যার কোন সঠিক হিসেব নেই।

পার্বত্যঞ্চলের মানুষ আর লাশ চাই না। রক্তির হোলি খেলা বন্ধ করতে চাই। পাহাড়ের কোন ললনা আর বিধবা হতে চাই না, সন্তান হতে চাই না পিতৃহারা। কিন্তু এ যুদ্ধ বন্ধ করবে কে? এটাই এখন পার্বত্যবাসীর সময়ের দাবি।

পাহাড়ে হত্যাকান্ডের সূত্রপাত যেভাবে:………..

পাহাড়ে যুদ্ধের কারণ বিশ্লেষণ করলে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা রিপোর্টে থেকে জানা যায়, হত্যাকান্ডের সূত্র পাত ঘটে চলতি বছরের ১৮মার্চ ইউপিডিএফ সমির্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দয়া সোনা চাকমা এবং একই সংগঠনের রাঙামাটি শাখার সাধারণ সম্পাদক মন্টি চাকমাকে গুমের মধ্যে দিয়ে।

এ ঘটনার পর ইউপিডিএফ প্রসিত গ্রুফ জেএসএস সংস্কার এবং ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক সংগঠনকে দায়ী করে আসছে। এ নিয়ে রাঙামাটি কোতয়ালী থানায় নানিয়ারচর উপজেলার চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা এবং ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের প্রধান তপন জ্যোতি চাকমাকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়েছিলো।

এরপর চলতি বছরের এপ্রিলের ২০ তারিখ থেকে ইউপিডিএফ তাদের আধিপত্য বিস্তারে রাঙামাটির দূর্গম বাঘাইছড়ি উপজেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সংস্কার’র (জেএসএস এমএন লারমা গ্রুপ) এলাকায় হানা দেওয়া শুরু করে। তাদের তান্ডবে ওইদিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে জনপ্রতিনিধিসহ ৫০পরিবার পালিয়ে এসে উপজেলা শহরে এসে আশ্রয় নেয়।

অপরদিকে চলতি মাসের ২ মে সকালে একই উপজেলার রূপকারী ইউনিয়নের নালকাটা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুফ এবং জেএসএস সংস্কার বন্ধুক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। তবে উভয়পক্ষের মধ্যে কেউ হত্যাহত হয়নি।

এবার ৩মে সকাল ১১টার দিকে নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেএসএস এমএন লারমা গ্রুপের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি শক্তিমানকে চাকমাকে উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এসময় শক্তিমানের সাথে থাকা একই সংগঠনের নেতা রূপম চাকমা গুলিতে গুরতর আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

  • Facebook
  • Twitter
  • Print Friendly

এ ঘটনার ২৪ঘন্টা পার হওয়ার আগে শুক্রবার (৪মে) দুপুর ১২টার দিকে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’র প্রধান তপন জ্যোতি চাকমাকে (বর্মা) গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এসময় মাইক্রোবাসে তার সাথে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক সমির্থিত যুব ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা সুজন চাকমা (৩০), একই সংগঠনের খাগড়ছড়িস্থ মহালছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি তনয় চাকমা (৩১), সেতু লাল চাকমা (৩৬) এবং মাইক্রোবাসের ড্রাইভার মো. সজিবও (৩৫) গুলিতে নিহত হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, তপন জ্যোতি নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শক্তিমানের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে খাগড়াছড়ি থেকে রাঙামাটিস্থ নানিয়ারচর উপজেলার বেতছড়ি এলাকায় পৌছালে বর্মার গাড়িকে লক্ষ করে গুলি ছুড়ে ওঁৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা। এসময় ঘটনাস্থলে গাড়িতে থাকা বর্মাসহ তিনজন নিহত এবং অপর দু’জনকে আহত অবস্থায় খাগড়াছড়ি নেওয়ার পথে তারা নিহত হয়।

এদিকে এ ঘটনার জন্য জেএসএস সংস্কার এবং ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বারবার পাহাড়ের আরেক আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুফকে দায়ী করে আসছে।

এ ব্যাপারে জেএসএস সংস্কার এমএন লারমা গ্রুপের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক সুধকর ত্রিপুরা এ ঘটনাগুলোর জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী করেছে। তিনি জানান, শান্তির পাহাড়ে অরাজকতা সৃষ্টি করতে ইউপিডিপএফ একের পর এক হত্যাকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক বর্মা গ্রুপের পক্ষ থেকেও এ হত্যাকান্ডের জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী করে আসছে।

এ সকল ঘটনা অস্বীকার করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’র (ইউপিডিএফ) মুখপাত্র মাইকেল চাকমা জানান, পাহাড়ের তৃতীয় কোন শক্তি অরাজকতা সৃষ্টি করার জন্য একের পর এক হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এ ধরণের হত্যাকান্ডের সাথে ইউপিডিএফ জড়িত নয়। তারা ভুল করে ইউপিডিএফ’র উপর দায়ভার চাপাচ্ছে।

তবে এ ধরণের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণ হিসেবে গোয়েন্দা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়- পাহাড়ে চাদাঁ আদায় এবং নিজেদের শক্তি জানান দিতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হচ্ছে পাহাড়ের এসব সশস্ত্র গ্রুপগুলো।