মঈন উদ্দীন বাপ্পী । হিলরিপোর্ট

রাঙামাটি: পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিকে বলা হয় রূপ বৈচিত্রের শহর। একদিকে সুউচ্চ পাহাড়, ঘন সবুজায়ন বন, অন্যদিকে কাপ্তাই হ্রদ। প্রকৃতি এখানে মিলেমিশে একাকার। পুরো বন যেন শান্তির সুবাতাস ছড়ায়। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে বিভিন্ন বণ্য প্রাণীর অভয় আশ্রম। এর মধ্যে বন্য হাতি, ষাড়, মায়া হরিণ, কালো হরিণ, গয়াল, শুকর, মেছো বাঘ, বন বিড়াল, সরীসৃপ প্রাণীর মধ্যে অজগর, গুইসাপ, গিরগিটি, বনরুই, সজারু এবং পক্ষী জাতের মধ্যে ময়না, টিয়া, শ্যামা, কোকিল, ঘুঘু, কাঠ টোকরা উল্লেখযোগ্য।

যুগের বিবর্তনে রাঙামাটিতে বেড়েছে মানুষের বসবাস, বাড়ছে প্রতিনিয়ত জনসংখ্যা। এখানে পাহাড়ের তুলনায় সমতল ভূমি কম হওয়ায় মানুষ বসবাসের জন্য স্থান হিসেবে বেঁচে নিচ্ছেন পাহাড়কে। পাহাড়কে বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলতে প্রতিনিয়ত মানুষ বন কেটে উজার করছে। যে কারণে পাহাড়ে দিনদিন বাড়ছে ভূমি ধ্বসের ঘটনা। মরছে মানুষ। বিলুপ্তি হচ্ছে জলজ এবং বন্য প্রাণী। জীব বৈচিত্র্য তার রূপ হারাচ্ছে।

এছাড়া বনে বিদেশী সেগুন জাতের গাছ রোপনের কারণে পাহাড়ের ক্ষয়রোধ হ্রাস পাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ঔষুধী গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। এক সময়ের রাঙামাটির গুরুত্বপূর্ণ বন আজ মানুষের অনাচারে ধ্বংসের পথে।  অতীতেও কোন কর্তৃপক্ষকে বনের সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। যে কারণে বন্য প্রাণী, জলজ প্রাণী সর্বপরী বনজ সম্পদ আজ তার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে জেলার রাঙামাটি সদর, কাউখালী, কাপ্তাই, লংগদু, বরকল, জুরাছড়ি, বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, রাজস্থলী উপজেলাগুলোর দূর্গম পাহাড়ি বনে বন্য হাতির বসবাস।

বন উজারের কারণে খাবারের খোঁজে হাতি চলে আসছে লোকালয়ে। হামলা চালাচ্ছে মানুষের বসত-বাড়িতে, মারছে মানুষ। মানুষও বাঁচতে হাতির পালেও উপর হামলা চালাচ্ছে, মরছে হাতি। রাঙামাটির বনজঙ্গলকে হাতির আস্তানা বলা হলেও আজ বৃহৎ আকৃতির এই প্রাণীটি দিনদিন বিলুপ্তির পথে।

একটি তথ্য সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-২০১৬ সালে আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার) এর জরিপে সারাদেশে মোট ২৬৮হাতি রয়েছে। এর মধ্যে দুই তৃতীয়াংশের হাতির বসবাস পার্বত্য চট্টগ্রামে (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান)।

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯-২০১৯ সাল পর্যন্ত আইইউসিএন এর জরিপ মতে, গত ১০ বছরে পাহাড়ে ২০টি হাতি মারা গেছে। এর মধ্যে বান্দরবানের লামা বনবিভাগের এলাকায় ১০টি, বান্দরবান পাল্পউড বনবিভাগের অধীনে ২টি, রাঙামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের এলাকায় ৫টি এবং রাঙামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের এলাকায় ৩টি।

এ নিয়ে হাতি মরাকে কেন্দ্র করে স্ব-স্ব এলাকার থানাগুলোতে একটি সাধারণ ডায়েরী (জিডি) করা হলেও এ ঘটনার জন্য কাউকে গ্রেফতার বা মামলা দায়ের করা হয়নি। তবে হাতির আক্রমনে মারা যাওয়া মানুষ এবং সম্পদহানী হিসেবে এ পর্যন্ত আটলক্ষ টাকা সহায়তা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত করেছে।

হাতি গবেষকরা বলছেন, নির্দিষ্ট ভাবে হাতির সংখ্যা গণণা করা কোনদিন সম্ভব নয়। কারণ হাতিদের মধ্যে দুইটি আলাদা শ্রেণী রয়েছে। একটি হলো আবাসিক অন্যটি অনাবাসিক।

তাদের দাবি, আবাসিক হাতিগুলো বাংলাদেশে থাকে। আর অনাবাসিক হাতিগুলো পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং কিছু সময় অবস্থান করে আবার চলে যায়। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের হাতিগুলো বেশির ভাগ স্থায়ী।

আইইউসিএন ২০১৫-১৬ সালের জরিপে বাংলাদেশের ১২টি এলাকাকে হাতির করিডোর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। করিডোরগুলোর মধ্যে রয়েছে- কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের অধীনে ৩টি, কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের অধীনে ৫টি এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের অধীনে ৪টি।

এগুলো হলো,উখিয়া-ঘুমধুম সীমান্ত,তুলাবাগান-পানেরছড়া, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি- রাজারকুল।ভ্রমরিয়াঘোনা-রাজঘাট,তুলাতলী-ঈদঘর,খুটাখালী-মেধাকচ্ছপিয়া, খাসিয়াখালী-সাইরুখালী ও সাইরুখালী-মানিকপুর।

পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে- রাঙামাটির কাপ্তাই-চুনতি-বরকল-লংগদু-কাউখালী। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এসব হাতির করিডোরগুলোতে বন উজার করে বসতি নির্মাণ করার কারণে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে। যে কারনে মানুষের আক্রমনে হাতি, হাতির আক্রমণে মানুষ মরছে।

সম্প্রতি ১৫টি হাতির একটি পাল বেশ কয়েক বছর আগে রাঙামাটি শহরের রাঙাপানি এলাকায় প্রবেশ করে মানুষের বসতিতে হামলা চালায়। এরপর মানুষও বাঁচতে হাতির পালের উপর হামলা চালালে দুইটি হাতি পাহাড়ের খাদে পড়ে মারা যায়। এরপর প্রশাসনের দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে কে বা কারা মরা হাতির মাংস, দাঁত, হাড় চুরি করে নিয়ে যায়।

রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলার পরিবেশ কর্মী ও আলোকচিত্রী রকি চাকমা বলেন, পাহাড় দিন দিন দখল হয়ে যাচ্ছে। বন হচ্ছে উজার। যে কারণে পাহাড়ে বন্য প্রাণীদের খাবারের সংকট দেখা দিচ্ছে, প্রাণীকূল আজ বিলুপ্তির পথে।

তিনি আরও বলেন, বর্ষাকাল আসলে আমাদের এলাকায় হাতির পাল খাবারের সন্ধানে চলে আসে। হামলা চালিয়ে বসত-ঘর ভাংচুর করে। মানুষও বাঁচতে হাতির পালের উপর হামলা চালায়। বন উজার, খাবার সংকট এবং নিরাপত্তার অভাবে হাতিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে।

পরিবেশ কর্মী রকি জানান, অপার সম্ভবনাময় আমাদের বন সম্পদ রক্ষা করতে পারলে আমাদের জীববৈচিত্র এবং বন্যপ্রাণীকূল রক্ষা করা সম্ভব। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখনো উদ্যাগী হওয়া উচিত বলে যোগ করেন তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও লেখক শাওন ফরিদ বলেন, আমাদের প্রধান দায়িত্ব বন রক্ষা করা। আর বন রক্ষা করতে পারলে হাতিসহ সকল প্রাণীকূল এবং জীববৈচিত্র রক্ষা করা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, এজন্য আমাদের সচেতন হওয়া উচিত। পাহাড়ের সৌন্দর্য এবং পরিবেশ রক্ষায় বন রক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়টি মাথায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে তিনি অনুরোধ জানান।

পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিন বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো: রফিকুজ্জামান বলেন, রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলা হচ্ছে হাতির গুরুত্বপূর্ণ করিডোর। এই এলাকায় প্রায় ৫৫টি হাতি রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই করিডোরগুলোতে মানুষ বর্তমানে পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ করছে। যে কারনে হাতি তার চলাচলে বাঁধাপ্রাপ্ত হচ্ছে এবং বন উজারের কারণে খাবার সংকটে পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, যারা বন উজার করছে তাদের প্রতিহিত করা অত্যন্ত জরুরী। বন এলাকায় ঘর-বাড়ি নির্মাণে আমাদের সচেতন হওয়া উচিত। তাহলে আমরা হাতিসহ সকল বন্য প্রাণীকূল বাঁচাতে পারবো। এজন্য বন বিভাগও কাজ করছে বলে জানান তিনি।

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের চট্টগ্রাম বিভাগীয় বনকর্মকর্তা আবু নাছের মো: ইয়াছিন নেওয়াজ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে প্রায় ১০০-১৫০টি হাতি রয়েছে। একটি হাতির জন্য দৈনিক ২৫০ কেজি খাবার প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রতিদিন হাতির জন্য আড়াইশ কেজি খাবারের পাওয়া খুবই কঠিন। হাতি বেশিরভাগ খেয়ে থাকে গাছপালা ও লতা পাতা। বন উজারের কারণে হাতির খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে হাতি এবং মানুষের যে সংঘাত তা নিরসনের জন্য কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। মানুষ নিজে নিরাপদ থাকার জন্য হাতি লোকালয়ে আসার পথে বায়ো ফেন্সিং (কাটা গাছ, বেড়া ইত্যাদি দিয়ে) তৈরি করতে হবে। কোনভাবেই হাতির আবাসস্থল নষ্ট করা চলবে না। হাতির চলাচলের নিয়মিত পথ বা এলিফ্যান্ট করিডোরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না। হাতির জন্য সরকারি উদ্যোগে নিরাপদ অভয়ারণ্য গড়ে তোলা যেতে পারে।এই জন্য প্রচুর বনাঞ্চল বাড়তে হবে এবং গাছপালা রোপণ করেতে হবে বলে যোগ করেন এই বনকর্মকর্তা।