॥ মঈন উদ্দীন বাপ্পী ॥

পাহাড়ে বসবাসরত ১১টি জনগোষ্ঠির ১০ভাষা-ভাষির মধ্যে চাকমারা বলে বিজু, মারমা-রাখাইনরা বলে সাংগ্রাই, ত্রিপুরা বলে বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যারা বলে বিষু এবং অহমিয়ারা (আসাম) বলে বিহু। আর এসব কিছুর সংমিশ্রণে বলা হয় বৈসাবি।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পহেলা বৈশাখ এক নিয়মে পালন করলেও পাহাড়ে পালন করা ভিন্ন ভাবে। চার দিনব্যাপী ব্যাপক উৎসবে পাহাড় তখন আনন্দে মাতহারা হয়ে উঠে। যা দেশের কোথাও এমন বৈচিত্র দেখা যায় না। আর এমন বৈচিত্র এ অঞ্চলকে আলাদা স্বত্তার সৌন্দর্য দান করেছে। এজন্য পাহাড়ের এমন বৈচিত্রের সূখ্যাতিতে মুগ্ধ হয়ে অনেক পর্যটক এ উৎসবে যোগ দিতে অগ্রিম চলে আসে।

ফুল বিজু:
পাহাড়ে বসবাসরত উল্লেখযোগ্য এসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিরা চৈত্রের (বাংলা) ২৯ তারিখে ( খ্রি:১২এপ্রিল) ভোরে গঙ্গা দেবির উদ্দেশ্য নদীতে ফুল ভাসিয়ে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসুক, বিষু এবং বিহুর সূচনা করবে। ওইদিন সকালে নদীতে ফুল ভাসানোর পর, বাড়ি-ঘর পরিছন্ন, ফুল দিয়ে বাড়ির আঙিনা সাজানো, অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য বাহারি রকমের ফলমূল সংগ্রহ, নানা ধরণের পিঠা-পুলি বানানো, রান্না-বান্না করা, মদ সংগ্রহ এবং বিহারে গিয়ে ধর্মীয় উপসনা করার মধ্যে ওইদিন ব্যস্ত সময় পার করে। এছাড়া বাড়ির বয়ো:জৈষ্ঠদের গোসল করে করে নতুন কাপড় পড়ানো এবং তাদেরকে ভাল খাবার খাওয়ানো হয়।

মূল বিজু:

বাংলা বর্ষের চৈত্রের ৩০ তারিখে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি সম্প্রদায় ভোরে উঠে অতিথিদের আপ্যায়নে প্রস্তুতি নিতে থাকে। ওইদিন সারা দিন অতিথিদের খাওয়া-দাওয়া করানো, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে দেখা করাসহ আনন্দে উল্লাসে দিন কাটায় ওইসব জনগোষ্ঠি। ওইদিন অতিথিদের মাঝে বিশেষ খাবার পাজন
(বিভিন্ন সবজি মিশ্রিত তৈরি খাবার) পরিবেশন করা হয় । এছাড়া বাড়িতে তৈরি পিঠা-পুলি, ফলমূলসহ অন্যান্য খাবারসহ পাহাড়ি ঐতিহ্য মদ খেতে দেওয়া হয়।

গোজ্যাপোজ্যা:

পহেলা বৈশাখের দিনকে চাকমা ভাষায় বলা গোজ্যাপোজ্যা অর্থ্যাৎ ওইদিন বিশ্রামের দিন। ওইদিন ওইসব জনগোষ্ঠি সকালে উঠে মন্দিরে গিয়ে উপসনা, নতুন কাপড়-চোপড় পড়ে ঘুরাঘুরি এবং দিন শেষে বিশ্রাম গ্রহণ করে। এছাড়া ওইদিনও বাড়িতে বাড়িতে ভাল খাবার পরিবেশন এবং স্ব-স্ব গোষ্ঠিরা তাদের স্ব-স্ব নিয়ম- ভাষায় বিভিন্ন ধরণের খেলা- ধূলা, নাচ-গানে দিন কাটায়।

জলকেলি:

নববর্ষের পরের দিন তথা মগ বা রাখাইন সম্প্রদায় মতে মারমা-রাখাইন জনগোষ্ঠি ওইদিন সকালে গৌতম বৌর্দ্ধের মূর্তিকে স্মান করিয়ে মানুষের মাঝে পবিত্রতার ছোয়া ছড়িয়ে দেয়। এরপর ওইসব জনগোষ্ঠির যুবক-যুবতীরা গ্রামে গ্রামে জলকেলির আয়োজন করে। জলকেলির (‘মিঠারী’ মারমা ভাষা) মূল কারণ হলো পুরাতন বছরের সকল গ্লানি, দু:খ-কষ্ট এবং সকল অশুভ শক্তিকে বিদায় জানিয়ে মৈত্রিজালে বন্ধন সৃষ্ঠি এবং নতুন বছরে মঙ্গল কামনা করায় হলো এই জলকেলির উদ্দেশ্য। তবে জলকেলি কোন ধর্মীয় উৎসব নয় এটি সামাজিক উৎসব। তবে এ উৎসবকে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন স্থানে আয়োজন করে

এছাড়া জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন পহেলা বৈশাখির দিনে পান্তা উৎসব, আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করেছে।