মঈন উদ্দীন বাপ্পী । হিলরিপোর্ট

রাঙামাটি: করোনা ভাইরাসের রোষানলে পড়ে সারা পৃথিবী ক্রান্তিকালের মধ্যে দিয়ে দিন অতিবাহিত করছে। মানুষকে বাঁচাতে, মানব সমাজকে বাঁচাতে দায়িত্বশীল, সুশীল সমাজ, সরকার, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সকলে ব্যস্ততার মধ্যে দিন অতিবাহিত করতে গিয়ে হাপিয়ে উঠছে। পরের দিন পূর্নদমে ক্লান্ত শরীরে সাহস নিয়ে এগিয়ে চলছে মানব সমাজের রক্ষায়।

করোনা নামক মহা ভাইরাসটিকে মোকাবিলায় দিনের পর দিন চলছে গবেষণা। পৃথিবীর এক প্রান্ত অন্য প্রান্তের দিকে অবাক নয়নে থাকিয়ে আছে বেঁচে থাকার আকুলতার আশা নিয়ে। যদি কেউ না তাদের সহায় হয়, মুক্তির পথ দেখায়। সকল বৈষম্য আজ উবে গেছে শুধু বাঁচার তাগিদে। দু’চোখে অশ্রু ঝড়াচ্ছে আর সৃষ্টিকর্তার সহায় খুঁজছে।

মহাশক্তিধর আমেরিকা, সমুজ্জল নগরী ইউরোপ, লড়াইয়ের নগরী এশিয়া কেউ করোনার কাছে ইয়াত্তা পাচ্ছে না। করুনা তার আপন মহিমায় করায়ত্তকলে নিয়েছে পুরো পৃথিবী। গ্রাস করছে মানব সমাজ। দাফনে-কাপনে সবই হচ্ছে ছারখার।

এশিয়ার মধ্যে আধুনিক এবং অর্থনৈতিক ভাবে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া দেশটির নাম বাংলাদেশ। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানী ঔপনিবেশবাদ শাসনের ফলে দেশটিকে উঠতে অনেক কাল-ক্রমা উপক্রম করতে হয়েছে। দেশটি যখনি মাথা নাড়া দিয়ে উঠার চেষ্টা চলছে তখনি করানো নামব ভূতটি তার উপরও ভর করেছে। বন্ধ হয়ে গেছে দেশের অর্থনৈতিক চাকা। দেশের পুঁজিবাদি এবং কালোবাজারীরা পকেট ভারী থাকার কারণে এই দু:সময়ে আরাম-আয়েশে চলতে পারলেও কঠিন বিপদের মুখে পড়েছে মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র শ্রেণীর লোকেরা।

মহামারী ঠেকাতে স্বেচ্ছায় ঘরবন্দি থাকায় চরম কষ্টে দিন অতিবাহিত করছে এসব শ্রেণী। যদিও সরকার সেইসব জনগোষ্টিকে প্রণোদনা দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে সেই প্রণোদনা ভুক্তভোগীরা পাচ্ছে; নাকি হত গলিয়ে রাজনৈতিক শিকারে পকেট ভরছে অন্য কেউ। সরকারের নজরধারী বাড়ানোর দরকার।আবেগে মূল উদ্দেশ্যে থেকে কিছুটা সরে আসলেও বিবেক এবং দায়িত্বশীলতার জায়গায় ফিরে আসতে হয়েছে। তবে সেইসব কথা অন্য একদিন বলা হবে।

মাদক এই এক পুরনো মহামারী ভাইরাসের নাম। সেই মহামারীও করোনার চেয়ে ভয়ংকরে কোন অংশে কম নয়। এ নেশায় বুদ হয়ে তরুণ সমাজ ধ্বসে যাচ্ছে। হিরোইন, পেন্সিডিল, আফিম, সিসা, গাঁজা সর্বশেষ নেশা তালিকায় যুক্ত হয়েছে ইয়াবা। খোরদের নিকট বাবা নামেই বেশ পরিচিতি। বর্ডার পার করতে এবং বহন করতে সহজ এবং হাতের নাগালে কম দামে পাওয়া যাওয়ায় বাবায় গোগ্রাসে গিলছে উদ্দমী তরুণ সমাজকে।

করোনা মোকাবিলায় প্রশাসন দিন-রাত কাজ করতে গিয়ে হাপিয়ে উঠছে। মানব সমাজকে রক্ষা করতে যা কিছু করার দরকার তাই করছে। কিন্তু নেশার বাজার বন্ধ করতে না পারলে করুণার চেয়ে ভয়াবহ হবে এই ভাইরাস। জাতি হবে মেধা শূণ্য।
যদি তরুণ সমাজ সুস্থ না থেকে তাহলে দেশের উন্নয়নের কথা চিন্তা করে কি লাভ? যাদের জন্য ভোগ করতে সকল আধুনিক সুযোগ সুবিধার এত আয়োজন; তারা যদি অসুস্থ হয়, তাহলে এত্তসব করার দরকার কি?

পিতা তার পুত্রের জন্য সম্পদ আহরণ করে ভবিষ্যতে তার সন্তান যেন দুধে-ভাতে খেতে পারে। যদি সন্তান না থাকে তাহলে সেই সম্পদের কোন মূল্য নেই পিতার কাছে। সবই মরভূমি। সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করতে না পারলে আধূনিক দেশের চিন্তা করা মানে পিতার মূল্যহীন সম্পদের মতো।

সরকার, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সকলে করোনা মোকাবিলায় ব্যস্ত সময় পার করছে। আদালত প্রাঙ্গন বন্ধ। থানাগুলো নিরব হয়েছে। মামলা-মোকাদ্দামা নেই। পুলিশ ভাইয়েরা করোনা সচেতনায় দিন-রাত মাইকিং, প্রচার-প্রচারণায় মহা ব্যস্ত সময় পার করছেন।

এখন প্রশ্ন হলো করোনার এই ক্রান্তিকালে মাদককারবারীরা কোথায়? তারা কি হোমকোয়ারেন্টাইনে। কোন মাদকসেবী প্রতিদিন মাদক সেবন না করলে থাকতে পারে না বলে আমরা জানি।

দেশের সকল রুট বন্ধ। পথে পথে নিরাপত্তার চৌকি। তবে করোনার অজুহাতে তারাও কি মাদক সেবন ছেড়ে দিয়েছে? কিছুতেই না। কৌশল বদলিয়ে নিয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ডের সেইসব মাফিয়ারা। বন্ধ নেই তাদের কারবার। প্রতিদিন হাজার-হাজার ইয়াবা প্রশাসনের চোখে ফাঁকি দিয়ে দেশের সীমান্ত অতিক্রম করে দেশের নানা প্রান্তে মাদকসেবীদের কাছে পৌছে যাচ্ছে।

প্রশাসন যখন করোনার ক্রান্তিকাল নিয়ে ব্যস্ত সময় অতিক্রম করছে তখন অন্ধকার জগতের মাফিয়ারা উল্লাস করে তাদের রাজত্ব কায়েম করছে বিনা বাধায়। সেইসব কুচক্রের ব্যবসা সমতল পেরিয়ে পাহাড়ও দখল করেছে। পাহাড়েও তারা সমানতালে রাজত্ব করছে বিনা বাধাঁয়।

রাঙামাটিতে প্রশাসন সকাল থেকে করোনা মোকাবিলা এবং গভীর রাতে ক্লান্তি। আর মাদককারবারীরা এই মোক্ষম সময়কে কাজে লাগিয়ে সজাগ হয়ে জমাজমাট ভাবে বিনা বাধায় নেশার রাজত্ব কায়েম করছে।

একাধিক মাদকসেবী নাম প্রকাশ না করার সত্ত্বে অকপটে স্বীকার করছেন, করোনা-মরোনা কিছু বুঝি না। ভেড়া উঠলে বাঁচি না, নেশা ছ্ড়াা এক মূহর্ত থাকতে পারি না। তাদের মাল সময় হলে তাদের হাতে পৌছিয়ে দেওয়া হয়। তাদেরও আছে কমিশন ভিত্তিকে সেলার। যারা সরাসরি নেশাখোরদের হাতে মাদকদ্রব্য পৌছে দেয় নিরাপদে।

জেলা শহরের ভেদভেদী, কলেজগেইট, হাসপাতাল এলাকা, চম্পক নগর, কাঠালতলী, শান্তিনগর বাস টার্মিনাল এলাকা, রিজার্ভবাজার শহীদ মিনার, মাঠ প্রাঙ্গন, মহিলা কলেজ এলাকা, মহসিন কলোনী, পুরাতন বাস স্টেশন এলাকা, নতুন বাস স্টেশন এলাকা সর্বত্রয় মুখোশ বদল করে মাদককারবারীদের অবাধ বিচরণ চলছে। শুধু তাই নয় মাদক সেবনের জন্য নিরাপত্তার আশ্রয়স্থল হয়েছে কাপ্তাই হ্রদে নতুন করে জেগে উঠা চরগুলো।

সহজ কথা খ্বু সহজে বলাও নাকি কঠিন। তবে অকপটে সহজ বাক্যে বলতে চাই, আমরা বাঁচতে চাই, শান্তিতে বাঁচতে চাই। সহজ ভাবে, নিরাপদে করোনাকাল কাটাত চাই। পুরো পৃথিবী করোনামুক্ত হোক, আনন্দের ফোয়ার ফুটে উঠুক পৃথিবী জুড়ে।

পাশাপাশি দীর্ঘ পরিকল্পনায় আমাদের এগিয়ে যেতে হলে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা তোলা অতিব জরুরী। তাই চোখ খোলা রাখি, কানকে সজাগ রাখি। করোনার সচেতনতার পাশাপশি মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ, প্রশাসন, আমজনতা সকলের জিহাদ করা নৈতিক দায়িত্ব।

পুলিশ ভাইদের প্রতি শ্রদ্ধাভরে অনুরোধ, মাদকসেবীরা ঘুমিয়ে নেয়, দাপড়িয়ে বেড়াচ্ছে সকল রুটে। করোনার মোকাবিলা কর্মকান্ডের পাশাপাশি এসব মাদককবারীদের বিরুদ্ধে তীক্ষè দৃষ্টি দেওয়া উচিত। তা না হলে এক মহামারী ঠেকাতে আমাদের না হয় অন্য মাহামারী ভর করে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

লেখক: মঈন উদ্দীন বাপ্পী, এডিটর, হিলরিপোর্ট ২৪ ডট নিউজ