॥ মঈন উদ্দীন বাপ্পী ॥

আসছে নতুন বছর। নতুন বছরে সবার আশা পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিলে যেন আর লাশের সংখ্যা না বাড়ে। সবুজ অরণ্য, গিরি হ্রদ ঘেরা পাহাড়ি এই জনপদ যেন আরও সবুজ হয়ে ওঠে। রক্তের হোলি খেলা বন্ধ হয়ে শান্তির পায়রা উড়াক সবাই এমনটাই প্রত্যাশা পাহাড়ের শান্তিকামী সব সম্প্রদায়ের।

২০১৯-এ রাঙামাটিতে ঘটে যাওয়া ঘটনা:

৪ জানুয়ারি বাঘাইছড়ির বাবু পাড়ায় ব্রাশ ফায়ারে বসু চাকমাকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে পাহাড়ের উত্তেজনা এবং হত্যাকান্ডের সূচনা ঘটে। এরপর সবচেয়ে বড় যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে তা হলো গত ১৮ মার্চ বাঘাইছড়ি উপজেলায় নির্বাচনী কাজ শেষে ফেরার পথে নির্বাচনী দায়িত্বরত লোকজনের গাড়িবহরে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ। ওই সন্ত্রাসী হামলায় আটজন নিহত হন। ঘটনার পর থেকে হামলাকারীরা পলাতক রয়েছে। এ ঘটনায় নিহতদের স্বজনরা এখনো কোনো বিচার পাইনি।

গত ১৬ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল রাঙামাটিতে আসেন। তার সফরের মূল বিষয়বস্তু ছিল পাহাড় থেকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক নির্মূল করা। এজন্য তিনি সরকারের উচ্চপদস্থ একটি দল নিয়ে আসেন এবং পাহাড়ের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা, পদস্থ কর্মকর্তাসহ নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে পাহাড়ে র‌্যাব মোতায়েন করার মতো যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল পার্বত্য চট্টগ্রামের চলমান জটিল প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে গুরুত্বপূর্ণ ওই বৈঠকে পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, তিন পার্বত্য জেলা থেকে যেকোন মূল্যে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক নির্মূল করা হবে। শান্তিচুক্তি পরবর্তী সরকার যেসব স্থান থেকে সেনা ক্যাম্প উঠিয়ে নিয়েছিল, সেখানে পুনরায় বিজিবি, পুলিশ এবং র‌্যাব মোতায়েন করা হবে। এজন্য পাহাড়ের নিরাপত্তায় পুলিশ এবং বিজিবির জন্য আধুনিক সরঞ্জম এবং হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করা হবে।

তখন মন্ত্রী তার বক্তব্যে তিন পার্বত্য জেলা ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে খুব শিগগিরই সীমান্তসড়ক তৈরির কাজ শুরু করা হবে বলে জানান।

২০১৯ সালের সবচেয়ে আলোচিত সমস্যাটির নাম ‘ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি আইন’। এ আইনের কারণে পাহাড়ের বাসিন্দারা চরম শঙ্কিত। পাহাড়িরা এ আইন বাস্তবায়ন চাইলেও তাদের সমসংখ্যক বাঙ্গালি জনগোষ্ঠি তা সংশোধনের দাবিতে অনড়। তবে বিষয়টি নিয়ে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপ্রতি আনোয়ারুল হক জানান, ভূমি বিরোধ আইন পাহাড়ের কোনো মানুষকে জটিলতায় ফেলবে না। আইনের মাধ্যমে সকল জনগোষ্ঠির স্বার্থ রক্ষা হবে।

সরকারি হিসেব মতে, জানুয়ারি-ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১টি বন্দুক, একটি রিভলবার চারটি পিস্তল, নয়টি এলজি, একটি শাটারগান, একটি জি থ্রি রাইফেল, দুইটি ম্যাগজিন, ৩৮টি কার্তুজ, ১১২টি গুলি উদ্ধার করা হয়।

চোরাচালান বিরোধী টাস্কফোর্স সংক্রান্ত ১২ হাজার ২৬৫টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে আটক পণ্যমূল্য দুই কোটি ৪৬ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৫ টাকা। এ সংক্রান্ত৭৮টি মামলায় ৯০ জনকে আটক করা হয় বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
তবে পুরো বছর জুড়ে পাহাড়ের চলমান হত্যাকান্ড থামানো যায়নি। পুলিশ ও গোয়েন্দা তথ্যর ভিত্তিতে জানা যায়, ডিসেম্বর-২০১৯ পর্যন্ত ৪২ জনকে হত্যা করা হয়েছে।

এসব হত্যাকান্ডের মূল রহস্য হলো- সশস্ত্র দলগুলো তাদের আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও এলাকা দখল এবং নিজেদের স্বার্থদ্বন্ধ নিয়ে প্রতিনিয়ত বন্ধুকযুদ্ধে লিপ্ত হয়। আর এ যুদ্ধের মধ্যে সশস্ত্র ক্যাডাররা বেশি নিহত হয়েছেন।

২০১৮ সালে রাঙামাটিতে খুনের শিকার হয় ২৮ জন। গেল বছরের ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত হত্যার শিকার হয়েছে সর্বমোট ৪২ জন। এসব হত্যাকান্ডে জেলার সব থানায় ১৫টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দাবি, পাহাড়ে শান্তি আনার ব্যাপারে কোনো পক্ষ উদ্যোগ নেয়নি। চুক্তির এতো বছর পার হলেও পাহাড়ে এখনো অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ করা যায়নি।

এর মূল রহস্য হলো- চাঁদাবাজি, এলাকা নিয়ন্ত্রণ এবং নিজেদের শক্তি জানান দিতে সন্ত্রাসী দলগুলো প্রতিনিয়ত সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হয়। পাহাড় থেকে যদি অবৈধ অস্ত্র বন্ধ করা না যায় তাহলে এ হত্যাকান্ড কোনোভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে তারা অভিমত ব্যক্ত করেন।

রাঙামাটি পুলিশ সুপার আলমগীর কবির বলেন, একদিকে পাহাড়ি এলাকা অন্যদিকে পুলিশের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তাই ইচ্ছে থাকলেও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যথা সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। যদি পুলিশের কাছে অভিযান পরিচালনার জন্য সরঞ্জাম থাকতো তাহলে পাহাড় থেকে সন্ত্রাসীদের উৎখাতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যেতো।