মঈন উদ্দীন বাপ্পী । হিলরিপোর্ট

রাঙামাটি:বৈশ্বিক করোনার প্রভাবে মানুষ যখন ঘর বন্দি, তখনি এ সুযোগে প্রকৃতি দেখাতে শুরু করেছে তার অপরূপ সজ্জা। প্রকৃতির উপর মানুষের ব্যাবিচারের কারণে প্রকৃতি তার বর্ণ হারাতে বসেছিলো এতদিন। করোনা মানুষের জন্য অভিশাপ হলেও প্রকৃতির জন্য আর্শিবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


তাইতো করোনার ভয়ে মানুষ যখন তার চলাচল বন্দ করে দিয়েছে, এই সুযোগ নিয়ে প্রকৃতি তার আপন রূপ প্রদর্শন শুরু করে দিয়েছে। নদী হয়েছে স্বচ্ছ জলরাশি, পাহাড় হয়েছে সবুজের চেয়ে আরও সবুজ। অরণ্য বাড়িয়েছে তার পরিধি । চোখ মিললে চারদিক প্রকৃতির জয়জয়কার। প্রকৃতি তার আমন মহিমায় হাসির দোল দিচ্ছে।

প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্যের নাম হলো রূপের রাণী রাঙামাটি। দেশ ও দেশের বাইরে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের জন্য আলাদা সুখ্যাতি রয়েছে জেলাটির। তাই মানুষ কোলাহল ছেড়ে প্রকৃতির ছোঁয়া পেতে এ জেলায় ছুটে আসে প্রতিবছর।এখানে রয়েছে বিশাল আকৃতির পাহাড় আর কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জল। যা মিলেমিশে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে আপন মহিমায় এক অনন্য স্থান দান করেছে।

বেশ কিছু বছর ধরে মানুষ পাহাড় কেটে ঘর-বাড়ি নির্মাণ এবং কাপ্তাই হ্রদে বর্জ্য অপসারণের ফলে অপরূপ রাঙামাটি তার আপন সৌন্দর্য হারাতে বসেছিলো। কিন্তু করোনার আর্শিবাদ পেয়ে রাঙামাটি তার হারানো রূপ আবার ফিরে পেতে শুরু করেছে।
তাই তো চলতি একটি কথা রয়েছে -কাল কারো জন্য আর্শিবাদ আবার কারোর জন্য অভিশাপ। তাইতো করোনা মানব জাতির জন্য অভিশাপ হলেও প্রকৃতির জন্য আর্শিবাদ হয়ে আবির্ভাব হয়েছে।

করোনার এ সুযোগে পাহাড়ি জেলা রাঙামাটির বেশ কিছু পাহাড় এখন বিঝু ফুলের সমারোহ। প্রকৃতিতে মেলে ধরছে তার আপন সৌন্দর্য। চোখ পড়লে ফিরাতে মন চাই না। তবে এই বিঝু ফুলটির দু’টি জাত লক্ষ্য করা গেছে। জাত দু’টির মধ্যে একটি হলো লিলি অপরটি হলো ভুঁইচাপা।

তবে স্থানীয়রা জাত দু’টিকে বিজু ফুল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। কেননা পাহাড়ে চৈত্র-বৈশাখের মাঝামাঝি সময়ে ফুলগুলো পাহাড়ে ফুটে। ফুলগুলো ফুটলে পাহাড়িরা ধারণা করে তাদের বৈসাবি উৎসবের সময় হয়েছে। তাই তারা এটাকে সৌভাগ্য ফুল বলে বিবেচেনা করে।

জেলা শহরের পাহাড়ি এলাকা ঝগড়া বিল গ্রামে গেলে দেখা মিলে এসব ফুলের। লিলি ফুলটি পাহাড়ি মাটির সাথে মিশে ফুটে উঠে আর ভুঁইচাপা ফুলটি মাটির থেকে প্রায় এক ফুট লম্বা হয়ে ফুটে।

এছাড়াও সরেজমিনে আঙ্গুর ফুল এবং এক শ্রেণীর পাহাড়ি রক্তাজবা ফুলের দিখা মিলে। এসব ফুলগুলো পাহাড়কে নতুন রূপ দিয়েছে। যে কেউ দেখলে চোখ আটকে যাওয়ার মতো।

তবে স্থানীয়দের মাঝে কথিত আছে, কেউ যদি আঘাতপ্রাপ্ত হয় তাহলে আঙ্গুর ফুলের পাতা আগুনে গরম করে আক্রান্ত স্থানে লাগালে ব্যাথা উপশম হয়। তবে এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা এই ফুলটির চাষ করে না। চৈত্র-বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সময়ে ফুলগুলো ফুটে। পাহাড়সহ তাদের বাড়ির আঙ্গিানাকে আলাদা সৌন্দর্য দান করে। বিজুর মৌসুমে ফুলগুলো ফুটে বলে পাহাড়িদের নিকট বিজু হিসেবে বেশ পরিচিতি। তবে তাদেও কাছে ফুলটির জাত সম্পর্কে কোন ধারণা নেই।
ঝগড়া বিল এলাকার পাহাড়ি বাসিন্দা স্মৃতি মণি চাকমা বলেন, আমরা ছোটকালে দেখেছি পাহাড়ে বিজুফুলসহ নাম না জানা অসংখ্য ফুল ফুটতো। কিন্তু পাহাড়ে ঝুম চাষের কারণে ফুলগুলো তার অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। এখন পাহাড়ে ফুলের দেখামিলা ভার।
কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে ঝুম চাষ বন্ধ থাকায় পাহাড় আবারো বিভিন্ন ফুল ফুঁটতে শুরু করেছে। এর মধ্যে হারিয়ে যাওয়া ফুলের মধ্যে অন্যতম বিজুফুল।

একই এলাকার বাসিন্দা রবিলাল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ফুল হলো সৌন্দর্যের প্রতীক, ভাগ্য-লক্ষীর প্রতীক। বেকার বসে আছি, কোন কাজ নেই। করোনার কারণে পাহাড়ে জুম চাষ কমে যাওয়ায় পাহাড়ে তেমন যাওয়া হচ্ছে না। তবে এর মধ্যে পাহাড়ে নতুন নতুন ফুল ফুটতে শুরু করেছে দেখে নিজের কাছেও খুব ভাল লাগছে।

ফুলপ্রেমী নুকু চাকমা বলেন,সময়ের তালে পাহাড় তার আপন সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। কিন্তু করোনা মানুষের জন্য আর্শিবাদ হলেও প্রকৃতির জন্য আর্শিবাদ হিসেবে আগমন করেছে। পাহাড় আবারো তার আপন রূপ ফিরে পেতে শুরু করেছে। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে পুরো পাহাড়।

নুকু আরও বলেন, ছোটকাল থেকে আমাদের মা-বাবাদেও কাছ থেকে শুনে আসছি এগুলো বিজু ফুল। তবে তার কোন বৈজ্ঞানিক নাম জানা নেই। এই ফুলগুলোকে পাহাড়িরা সৌভাগ্যর প্রতীক হিসেবে পরিগণিত করে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধদপ্তর রাঙামাটি অঞ্চলের উপ-পরিচালক প্রবণ কুমার চাকমা বলেন, বৈশ্বিক করোনার প্রভাবে আপাতত ঝুম চাষ কম হওয়ায় পাহাড়ে বিভিন্ন ফুলের দেখা মিলে। তবে পাহাড়িরা ফুলগুলোকে বিজু ফুল বলে আখ্যায়িত করলেও এর দু’টি জাত আমরা সনাক্ত করতে পেরেছি। এর মধ্যে ভুঁইচাপা এবং লিলি অন্যতম। তবে ফুলগুলোর কোন বৈজ্ঞানিক নাম তাদের জানা নেই বলে কৃষি কর্মকর্তা যোগ করেন।