মঈন উদ্দীন বাপ্পী । হিলরিপোর্ট

রাঙামাটি: ‘পৃথিবীতে কোন কিছু অর্জন করতে হলে কিংবা জয় করতে হলে কোন এক পক্ষের হতে হয় । এজন্য সেই পক্ষের ক্ষুধা মিটাতে বিলিয়ে দিতে হয় শরীর, মেহনত কিংবা মেধা। হতে হয় তাদের পা চাটা কুকুর’।

এই দুনিয়ায় জ্ঞানী-গুণীর কদর্যটা করা হয় না বললেই চলে। কারণ দুনিয়াটা চলছে দেওয়া-পাওয়ার মধ্যে দিয়ে। পুরো পৃথিবীর নিয়মই এমন ভাবে চলে আসছে বহুকাল ধরে।

তবে যারা এ ধরণের গদ বাধাঁ নিয়ম-ধারা ভেঙ্গে বের হতে পেরেছে তারাই এ জগতে রাজগিরি করেছে আর না হয় আস্তাকুঁড়ে জাহান্নামে জায়গা মিলেছে।

হেরে যাওয়া সেইসব মানুষেরা উপর ওয়ালাকে কথা বলতে ছাড়ে না। বারংবার দোষারোপ করে নিরব চোখে জল পেলে। তাদের বুকের বাম পাশের ব্যাথাটা কেউ দেখতে পাই না বা দেখতে পেলেও সেই ব্যাথা উপশম করার জন্য ভয়ে কেউ কাছেও ভিড়েও না।

তাই তো লেখক তার গ্রন্থে বলেছেন- ‘ঈশ্বর থাকেন ঐ গ্রামে, ভদ্র পল্লিতে-এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাবে না’!

তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে আমাদের দেশের অবস্থা আরও করুণ। এখানে মানবতাবোধ, দেশত্ববোধ, অর্পিত দায়িত্ব, ভালবাসা কোন কিছুর মূল্য নেই। কারণ এখানে প্রতিটি সম্পর্ক গড়ে উঠে দেওয়া-পাওয়ার মধ্যে দিয়ে। চলতি ভাষায় একটি কথা বেশ প্রচলতি- ‘তেলের মাথায় সবাই তেল দেয়, শুকনো মাথায় কেউ তেল দিতে আসে না’।

নোংরা রাজনীতির শিকার সেইসব বাসিন্দারা। উর্দ্ধমহলের কোন সাহায্য করার আগে মাথায় চিন্তা আসে রাজনীতির স্বার্থ আছে কিনা, নিজ গোত্রের কিনা, ব্যক্তি স্বার্থ আছে কিনা এইসব এইসব নানা চিন্তা। যদি থাকে বেশ ভাল, না হয় হিসেবে উল্টাবে না।

ভোটের আগে হবু জনপ্রতিনিধিরা মাগী, বেইশ্যা, মুচি-কামার, বস্তি, শত্রু-মিত্র সকলের দোয়ারে ছুটে যায় এবং তাদের পদধূলি নেয়। গ্লিসারিন লাগানো চোখে এক বাক্য ভাঙ্গা ক্যাসেটের মতো বারবার ভাজাতে থাকে; আমি আসলে আপনাদের ভাগ্য পরিবর্তন ঘটিয়ে দেওয়া হবে।

আর এসব বোকারা এসব উপর ওয়ালের কুটবৃদ্ধিতে পড়ে ভোট দিয়ে আসে। মনে হয় তারা মহা ফরজ কাজটি শেষ করে ফেলেছে। এইবার নেতাজি ভোটে জয়লাভ করে মসনদে আরোহণ করে। এইবার সেই ভোটমারা পাগলরা ছুটে যায় নেতাজির দরবারে তাদের মনকামনা পূর্ণ করার আশায়।

কিন্তু নেতার পালিত কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দে তারা ভয়ে পালিয়ে যায়। আর যারা এই শব্দ ভেদ করে ভিতরে প্রবেশ করে নেতার মুখখানা দর্শন করিলো, তখনি নেতা অগিাœমূর্তী রূপ ধারণ করিলো। নেতার এহেন অগ্নিমূর্তী চেহেরাখানা দেখে পাগলের বুকে ধূপ ধূপ শব্দ লাগতে শুরু করলো। এইবার তিনি পালিয়ে বাঁচলেন।

সর্বশেষ যে এই রুদ্রমূর্তি চেহেরা দেখেও দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম হলেন, নেতাজি তার উদ্দেশ্যে বয়ান ছাড়ে কে তুমি বাছা? তোমাকে তো চিনলাম না। পাগল বলে উঠে, স্যার আপনি আমার বস্তিতে গিয়ে কথা দিয়েছিলেন আমার মনকামনা পূর্ণ করবেন। ওহ; হ্যা, হ্যা, যাও তাহলে বিষয়টি দেখবো। মাস গেলো, বছর গেলো পাগলের মনকামনা পূর্ণ হয় না।আমরা সেই দেশে বাস করি। এটা হয়তো আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যের বিষয়, না হয় আমরা পাগলে দলে নিযুক্ত।

করোনায় পুরো দেশের অবস্থা টালমাটাল। স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি কোটি মানুষ।সরকার চিৎকার করে বলছে দেশের তৃণমূল পর্যায়ের কোন মানুষ অভুক্ত থাকবে না। তাই টন টন খাদ্য সামগ্রী পাঠানো হচ্ছে কেন্দ্র থেকে।

প্রশ্নটা হলো- কারা এসব ত্রাণ নিয়ন্ত্রণ করছে? যাদের জন্য পাঠানো হচ্ছে এইসব ত্রাণ, তারা সেইসব ত্রাণের দেখা পাচ্ছে তো? নাকি রাজনীতি শিকারে গ্রাস হয়েছে সব!
পেপার-পত্রিকা, অনলাইন, টেলিভিশন যেখানে চোখ মেলি সেখানে দেখা যাচ্ছে ওমুখ এলাকায় এত হাজার মানুষকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। তমুখ এলাকায় এত হাজারজনকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো আরও ভয়ংকর। দুই টাকার ত্রাণ দিতে গিয়ে নেতা আর চামচাবাজদের দাতে খিলখিল হাসিতে ভরা পুরো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। মনে হয় পুরো পৃথিবীর সকল দায়িত্ব তারা নিয়ে ফেলেছে।

আরও দু:খের সংবাদ হলো- সেইসব ত্রাণও তারা চুরি করে তথা দুর্নীতি করে। কারণ দুনীর্তিটা তাদের রগে রগে, রক্তে মিশে গেছে। কমিশন না নিলে তাদের ঘুমই হয় না। তাদের এহেন কর্মকান্ড দেখে মনে হয় তাদের বউ-বাচ্চা সকলে কমিশনে কেনা। নিজের বলে তো মনে হয় না।

চারদিকে যদি এতো ত্রাণের মেলা হয় তাহলে বাসু দেব দে এর মতো প্রকৃত শ্রমজীবি মানুষেরা এতদিনেও কেন ত্রাণের দেখা পায় না। তাদের ঘরে এতদিনে কেন ত্রাণ পৌছিয়ে দেওয়া হয় না। সহজ হিসেব, তারা নোংরা রাজনীতির শিকার। বাসু দেবের মতো হাজারও বাসুদেব এ ধরণের নোংরা রাজনীতির শিকার হচ্ছে প্রতিদিন, প্রতিমাস, প্রতিবছর, যুগে-যুগে।

এতক্ষণ যে বাসুদেব দে এর কথা বলছিলাম তিনি পেশায় একজন শ্রমজীবি মানুষ। আত্মসন্মানবোধের ভয়ে কারো দোয়ারে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ছুটছেন না। তার ঘরে ছেলে-মেয়ে-স্ত্রীসহ পাঁচ সদস্যর পরিবার। থাকেন রাঙামাটি শহরের ভেদভেদীস্থ কালিবাড়ি এলাকায়।

তিনি এখন পর্যন্ত কোন সহযোগিতার দেখা পায়নি। যখন তার সাথে কথা বলছিলাম তখন তিনি একটি বাড়িতে কাজ করে পেয়েছেন একশত পঞ্চাশ টাকা মাত্র। এই দিয়ে ১০টাকা কেজিতে ১০ কেজি চাল এবং বাকী টাকা দিয়ে আলু কিনে পরিবারের সদস্যদের মুখে আহার তুলে দিতে বাড়ির উদ্দেশ্যে ছুটছিলেন। চোখে-মুখে তার হতাশার ছাপ, দুশ্চিন্তা ভর করেছে। এ সময়ে তিনি কিভাবে চলবেন,পরিবারকে কি খাওয়াবেন?

তাহলে ত্রাণের সফলতা কোথায়? প্রশ্ন রাখলাম ত্রাণ বিতরণকারীদের কাছে……….