॥ মঈন উদ্দীন বাপ্পী ॥

ভালবাসা শব্দটি চার অক্ষরের হলেও এর বিশালত্ব বা পরিধি ব্যাপক। বিধাতা মানুষকে ভালবেসে এ ভূবন তৈরি করেছেন। ভালবাসার টানে মানুষ ছুঁটে যায় পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ভালবাসার কোন সীমারেখা নেই। ভালবাসা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। ভালবাসার টানে মানুষ সমাজ তৈরি করে নিয়েছে। গড়ে তুলেছে সংসার।

ভালবাসার একটি উদ্ধৃতি এখনো চলমান- তা হলো ভালাবাসা মানে না কোন জাত-পাত। হাজার বছর ধরে বংশ, বর্ণ, জাত এসব পার্থক্য ভুলে প্রেমিক মিলেছে প্রিয়ার টানে বা প্রিয়া মিলেছে প্রেমিকের টানে। এ কারণে জীবনও দিতে হয়েছে হাজার হাজার প্রেম পাগল মানুষকে। তবুও ভালবাসার জয়গান গেয়ে যায় প্রেম পাগলের দল।

আমাদের দেশে দিনটির যেভাবে শুরু:

১৯৯৩ সালের দিকে আমাদের দেশে ভালোবাসা দিবসের আবির্ভাব ঘটে। সাংবাদিক শফিক রেহমানের হাত ধরেই ভালোবাসা দিবসের সূচনা হয় । এ নিয়ে অনেক ধরনের মতবিরোধ থাকলেও শেষ পর্যন্ত শফিক রেহমানের চিন্তাটি নতুন প্রজন্মকে বেশি আকর্ষণ করে। সে থেকে এই আমাদের দেশে দিনটি পালন হয়ে আসছে।

  • Facebook
  • Twitter
  • Print Friendly

ভালবাসার উৎপত্তি:

১৪ ফেব্রুয়ারী ভালবাসা পালন করা হলেও ভালবাসা কিন্তু চিরকালের। দুনিয়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভালবাসা বেঁচে থাকবে মহাকাল হয়ে। ভালোবাসা নিয়ে ছড়িয়ে আছে কত কত পৌরাণিক উপাখ্যান। সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি সর্বত্রই পাওয়া যায় ভালোবাসার সন্ধান। আর তাই ১৪ ফেব্রুয়ারী মানেই প্রজন্মের কাছে একটি বিশেষ দিন। দুনিয়াজুড়ে দিনটিকে ধূমধাম ও আনন্দের সঙ্গে পালন করা হয়ে থাকে। তারুণ্যের অনাবিল আনন্দ আর বিশুদ্ধ উচ্ছ্বাসে সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও দিনটি নিয়ে থাকে প্রচুর মাতামাতি। ভালবাসা বা ভ্যালেন্টাইনস ডে কি? কীভাবে তার উৎপত্তি? প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়ে আছে নানা মুনির নানা মত।

তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ইতিহাসটি হচ্ছে- ধর্মযাজক সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের। ধর্মযাজক সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ছিলেন শিশু প্রেমিক। সামাজিক ও সদালাপি এবং খ্রিস্টধর্ম প্রচারক। আর রোম সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস ছিলেন বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজায় বিশ্বাসী। সম্রাটের পক্ষ থেকে তাকে দেব-দেবীর পূজা করতে বলা হলে ভ্যালেন্টাইন তা অস্বীকার করায় তাকে কারারুদ্ধ করে। সম্রাটের বারবার খ্রিস্টধর্ম ত্যাগের আজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করলে ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রীয় আদেশ লঙ্ঘনের দায়ে ভ্যালেন্টাইনকে মন্ট্যুদন্ড প্রদান করা হয়। সেই থেকেই দিনটির শুরু।

এ ছাড়া আরও একটি প্রচলিত ঘটনা আছে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে নিয়েই। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন কারারুদ্ধ হওয়ার পর প্রেমাসক্ত যুবক-যুবতীদের অনেকেই প্রতিদিন তাকে কারাগারে দেখতে আসত এবং ফুল উপহার দিত। তারা বিভিন্ন উদ্দীপনামূলক কথা বলে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে উদ্দীপ্ত রাখত।

এক কারারক্ষীর এক অন্ধ মেয়েও ভ্যালেন্টাইনকে দেখতে যেত। অনেকক্ষণ ধরে তারা দু’জন প্রাণ খুলে কথা বলত। একসময় ভ্যালেন্টাইন তার প্রেমে পড়ে যায়। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের আধ্যাত্মিক চিকিৎসায় অন্ধ মেয়েটি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়।

ভ্যালেন্টাইনের ভালোবাসা ও তার প্রতি দেশের যুবক-যুবতীদের ভালোবাসার কথা সম্রাটের কানে গেলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারী তাকে মৃত্যুদন্ড দেন।

এছাড়া খ্রিস্টীয় ইতিহাস মতে, ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের সা¤্রাজ্যবাদী, রক্তপিপাষু রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের দরকার এক বিশাল সৈন্যবাহিনীর। একসময় তার সেনাবাহিনীতে সেনা সংকট দেখা দেয়। কিন্তু কেউ তার সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে রাজি নয়। সম্রাট লক্ষ করলেন যে, অবিবাহিত যুবকরা যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে অত্যধিক ধৈর্যশীল হয়। ফলে তিনি যুবকদের বিবাহ কিংবা যুগলবন্দী হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। যাতে তারা সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে অনীহা প্রকাশ না করে।

তার এ ঘোষণায় দেশের যুবক-যুবতীরা ক্ষেপে যায়। যুবক সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামের এক ধর্মযাজকও সম্রাটের এ নিষেধাজ্ঞা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। প্রথমে তিনি সেন্ট মারিয়াসকে ভালোবেসে বিয়ের মাধ্যমে রাজার আজ্ঞাকে প্রত্যাখান করেন এবং তার গির্জায় গোপনে বিয়ে পড়ানোর কাজও চালাতে থাকেন।

একটি রুমে বর-বধূ বসিয়ে মোমবাতির স্বল্প আলোয় ভ্যালেন্টাইন ফিস ফিস করে বিয়ের মন্ত্র পড়াতেন। কিন্তু এ বিষয়টি একসময়ে সম্রাট ক্লডিয়াসের কানে গেলে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি সৈন্যরা ভ্যালেন্টাইনকে হাত-পা বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে সম্রাটের সামনে হাজির করলে তিনি তাকে হত্যার আদেশ দেন।

আরেকটি খ্রিস্টীয় ইতিহাস মতে, গোটা ইউরোপে যখন খ্রিস্টান ধর্মেও জয়জয়কার, তখনও ঘটা করে পালিত হতো রোমীয় একটি রীতি। মধ্য ফেব্রুয়ারী গ্রামের সকল যুবকরা সমস্ত মেয়েদের নাম চিরকুটে লিখে একটি পাত্রে বা বাক্সে জমা করত।

অতঃপর ওই বাক্স হতে প্রত্যেক যুবক একটি করে চিরকুট তুলত, যার হাতে যে মেয়ের নাম উঠত, সে পূর্ণবৎসর ওই মেয়ের প্রেমে মগ্ন থাকত। আর তাকে চিঠি লিখত, এ বলে ‘প্রতিমা মাতার নামে তোমার প্রতি এ পত্র প্রেরণ করছি।’ বছর শেষে এ সম্পর্ক নবায়ন বা পরিবর্তন করা হতো।

এ রীতিটি কয়েকজন পাদ্রীর গোচরীভূত হলে তারা একে সমূলে উৎপাটন করা অসম্ভব ভেবে শুধু নাম পাল্টে দিয়ে একে খ্রিস্টান ধর্মায়ণ করে দেয় এবং ঘোষণা করে এখন থেকে এ পত্রগুলো ‘সেন্ট ভ্যালেনটাইন’-এর নামে প্রেরণ করতে হবে। কারণ এটা খ্রিস্টান নিদর্শন, যাতে এটা কালক্রমে খ্রিস্টান ধর্মেও সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায়।

অন্য আরেকটি মতে, প্রাচীন রোমে দেবতাদের রানি জুনোর সম্মানে ১৪ ফেব্রুয়ারি ছুটি পালন করা হতো। রোমানরা বিশ্বাস করত যে, জুনোর ইশারা-ইঙ্গিত ছাড়া কোনো বিয়ে সফল হয় না। ছুটির পরদিন ১৫ ফেব্রুয়ারি লুপারকালিয়া ভোজ উৎসবে হাজারও তরুণের মেলায় র‌্যাফেল ড্র’র মাধ্যমে সঙ্গী বাছাই প্রক্রিয়া চলত।

এ উৎসবে উপস্থিত তরুণীরা তাদের নামাংকিত কাগজের স্লিপ জনসম্মুখে রাখা একটি বড় পাত্রে ফেলত। সেখান থেকে যুবকের তোলা সিøপের তরুণীকে কাছে ডেকে নিত। কখনও এ জুটি সারা বছরের জন্য স্থায়ী হতো এবং ভালোবাসার সিঁড়ি বেয়ে বিয়েতে গড়াতো ওই সম্পর্ক। ওই দিনের শোক গাঁথায় আজকের এই ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’। এমন অনেক প্রচিলিত ঘটনা, তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস নিয়ে। একেকজন একেকভাবে এর যুক্তি ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন।

 

  • Facebook
  • Twitter
  • Print Friendly

ভালবাসা নিয়ে যে যার মতামত:

রাঙামাটি সরকারি মহিলা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী তামজিদা তামাসুম তার সঙ্গী রোমানা ইয়াসমীন এবং নাজমিন নাহার এ্যানীকে নিয়ে বেড়াতে আসেন রাঙামাটির পলওয়েল পার্কে।

তারা জানান, ভালবাসা বলে বুঝানোর মতো বিষয় না। ভালবাসা থাকে হৃদয় জুড়ে। তাইতো মা-বাবা, ভাই-বোন ছাড়া এক মূহুর্ত কল্পনা করা যায় না।

একই কলেজের শিক্ষার্থী তনুশ্রী চাকমা ও তৃষা চাকমা এসেছেন ভালবাসা দিবসের দিনে ঘুরতে। তারাও বলেন- ভালবাসা আছে বলে মানুষের প্রতি মানুষের এত টান। ভালবাসার কারণে পৃথিবী এত সুন্দর।

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা থেকে রাসু পাল ও এ্যানি পাল পাল নামের নতুন দম্পত্তি হানিমুনে বেড়াতে এসেছেন রাঙামাটির পলওয়েল পার্কে। রাসু একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরী করেন। তিনি জানান, আমাদের বিয়ে মাত্র ছয়মাস। দিন যতই গড়াচ্ছে ততই আমাদের ভালবাসা বেড়েই চলেছে। আমরা একজন আরেকজনকে ছাড়া এক মূহর্ত থাকতে পারি না।

 

তাই তো বলা যায়; ভালবাসা মানে কোন বন্দি শব্দ নয়। ভালবাসার নেই কোন সীমারেখা। যুগের বির্তনেও ভালবাসা রয়ে যাবে ভালবাসার টানে। ভালবাসা ছুঁয়ে যাক হৃদয় আঙিনায়…………………………….