॥ দীপ্ত হান্নান ॥

আইসল্যান্ডের বিপক্ষে নিস্প্রভ ছিলেন, তেজোদীপ্ত দেখা যায়নি। গুরুত্বপুর্ণ মূহর্তে মিস করেছেন পেনাল্টিও। পয়েন্ট ভাগাভাগি করে অপেক্ষাকৃত দুর্বল আইসল্যান্ডের সাথে মাঠ ছেড়েছে মেসির আর্জেন্টিনা।

নাহ, অতি মানবীয় বা ভিন গ্রহী কারিশমা দেখাতে পারেননি মেসি। উল্টো, দলকে শংকা থেকে মুক্ত করতে পারেন নি। শংকিত পদযাত্রাই শুরু মেসি আর্জেন্টিনার।

দুনিয়া জুড়ে ফুটবলের ভক্ত যতটা, মেসির ভক্তও ততটা কম না। আমি, চারবছর পরপর বিশ্বকাপের দর্শকদের কথা বলছি না। ওরা বিয়ের বরযাত্রীর মত। এল, বউ-জামাই দেখল, পেটপুরে খেল, তারপর চলে গেল। এরপর, কার খবর কে রাখে।

আমি তাদের কথা বলছি, যাদের আত্মা-রক্তে ফুটবল মিশে আছে, যারা রাত জেগে স্প্যানিশ, সিরি আ, ইপিএল, বুন্দেসলিগা বা চ্যাম্পিয়নস লীগে মেসি, রোনাল্ডো, নেইমার, সালাহদের খেলা দেখার জন্য রাতের ঘুম হারাম করে পড়ে থাকে।

আমরা ওদের খেলা দেখতে দেখতে অভ্যস্থ, ওরা কখন কি করে, কখন ধসে পড়ে, কখন উত্থান ঘটনায় সবই হাতের নখের ডগায়। ফুটবল বিশ্বকে ঘুম হারাম করা এসব তারকারা নিজেদের দিনে বাঘা বাঘা দলগুলিকে নাকাকি-চুবানি খাওয়াই ঠিক, তবে নিজেদের ব্যর্থতার দিনে একেবারে নিম্নমানের দলের কাছে নাকানি-চুবানি খেতেও ভুল করে না। এটাই ফুটবল, এটাই ফুটবলের রহস্য।

ফুটবল বিশ্বের কাছে মেসিকে বলা হয় ভিনগ্রহের ফুটবলার। কেউ কেউ বলে, ফুটবলের কাছে বিশ্বকাপ পাওনা মেসির। সত্যি কি তাই? বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে পেনাল্টি মিস করা, কি করে মেসি ভিনগ্রহের হতে পারে? কেনই বা ফুটবলের কাছে বিশ্বকাপ পাওনা থাকবে। কি করেছে সে? ব্যালন ডি অর জিতেছে ৫ বার, গোল্ডেন শু ৫ বার, ৯১ গোল করে একবছরে সর্বোচ্চ রেকর্ড। সবমিলিয়ে গোল সংখ্যা ৫৪৬টি। হ্যাট্রিক ২৯টি।

বিশ্বকাপ ফাইনালে একবার ও কোপার ফাইনালে দুইবার। ক্লাবের হয়ে শিরোপা জিতেছে এর পর চারটি লা-লিগা শিরোপা, দুবার চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শিরোপা, দুই কোপা দেল রে ট্রফি, তিন স্প্যানিশ সুপার কাপ, দুবার বিশ্ব ক্লাব কাপ ও এক জোড়া ইউরোপিয়ান সুপার কাপ ট্রফি। রয়েছে আরো অনেক কৃতিত্ব, যা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়।

মেসির একটি গুণ হচ্ছে, যখন সে মনে করে দলকে ভরাডুবি থেকে রক্ষা করতে তাঁর বিকল্প নেই, তখনই সে জ্বলে উঠে, অতি মানবীয় কিছু করে বসে। এরকম নজীর ভুড়ি-ভুড়ি। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে দল যখন খাদের কিনারায় তখনই এই ভিনগ্রহী ফুটবলার হ্যাট্রিক করে দলকে বিশ্বমঞ্চের ফুটবলে জায়গা করে দিলেন।

এই অতিমানবীয় ফুটবলারটি কি পেনাল্টি মিস করতে পারে? অবশ্যই পারে। এটা নতুন নয়। আগেও বলেছি, বিশ্বকাপ ফুটবলের বাইরে যারা ক্লাব ফুটবলের রাতজাগা সারথি তারা জানেন, পেনাল্টি মিসের ঘটনা।

এটাই প্রমান করে, মেসি মানুষ। রক্ত মাংশের মানুষ। চাপ সহ্য করার বা না করার ক্ষমতা তারও আছে। নিজের সাথে না মানিয়ে চলা একঝাঁক উঠতি, সম্ভাবনায় তরুন ফুটবলার নিয়ে বিশ্বমঞ্চে দাপিয়ে বেড়ানো পরীক্ষিত এ সৈনিকের জন্য বিশাল চাপ। সেই চাপটাই মাঝেমধ্যে তাকে বিচ্যুতি ঘটায়, নিস্প্রভ করে রাখে। এটা নতুন নয়, ক্লাব বার্সেলোনায়ও তাই হয়। ফুটবলটা এজন্য আকর্ষনীয়, রহস্য বটে।

যারা মেসিকে অতি মানবীয় ভিনগ্রহী ফুটবলার ভাবেন, একটু মাটিতে নামেন। রক্ত-মাংশের মানুষটিকেও ভুল করা-ভুল শোধরাবার অধিকার দেন। যেভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল করছেন, যেভাবে মেসির পিছনে লেগেছেন, যেভাবে টিম আর্জেন্টিনাকে তুলোধুনো করছেন, সবই বুঝি। ফুটবলটাকে ইস্যু করে কিছু নোংরা খেলায় মাতানো ছাড়া আর কি আছে?

যদি সত্যিকারের ফুটবল ভক্ত হয়ে থাকেন, আপনাকে মেনে নিতে হবে মেসি মানুষ, রক্ত-মাংশে গড়া মানুষ। যদি না মানেন, তাহলে আপনি সেই বিয়ের বরযাত্রীর মতই, যারা কনে পক্ষের এত আয়োজনের পরও পেট পুরে খেয়ে নাক ছিটকাতে ছিটকাতে বলেন, এত বাজে খাবার জীবনেও খাইনি।