॥ মঈন উদ্দীন বাপ্পী ॥

রাঙামাটি শহরের মহিলা কলেজ রোডে ভবন ধসে ৫টি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার সেই আলোচিত ঘটনার জন্য দায়ী মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে বলে ধারণা করছে ভূক্তভোগীরা।

ঘটনার দেড় বছরের মাথায় পুলিশ এই ঘটনার অভিযোগ পত্র গঠন করলেও আশ্চার্যজনকভাবে অভিযোগ পত্র থেকে নিস্কৃতির সুপারিশ পেয়ে গেছেন, জেলা প্রশাসকের তদন্ত রিপোর্টে মূল মালিক বলে উল্লেখিত তৈয়ব কন্ট্রাক্টর।

অন্য যে দু’জনকে অভিযোগপত্রে আসামী হিসেবে সনাক্ত করা হয়েছে, তাদের মধ্যেও একজনের বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই, অপরজন নিছক সহযোগী।

‘সরকারি খাস জমি দখল করে অবৈধভাবে ইমারত নির্মাণের মাধ্যমে এ ধরণের মৃত্যুফাঁদ রচনাকারীরা আইনের ফাঁক ফোকর গলে এভাবে নিস্কিৃতি পাওয়ার সংস্কৃতি চালু হলে ভবিষ্যতে আরো অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের উদ্বুদ্ধ হতে পারে এক শ্রেণির অতি লোভি মানুষ’। এমন মতামত ব্যক্ত করেছেন, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা। তার মতে এতে অবৈধ দখল, অনুমোদনহীন ইমারত নির্মাণ তো উৎসাহিত হবেই। উপরন্তু আইনের প্রতিও মানুষের আস্থা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

২০১৬ সালের ৪ অক্টোবর বিকেল বেলা কোনো ঝড়-বাদল ছাড়াই হঠাৎ করেই রাঙামাটি মহিলা কলেজ রোডের একটি দ্বিতল ভবন পানিতে হেলে পড়লে তিন শিশুসহ পাঁচজন ভবনের ভিতর আটকে পড়ে। ফায়ার সার্ভিস ছাড়াও নৌবাহিনী থেকে ডুবুরি এনে তিন দিনের অবিরাম অভিযানে তাদের উদ্ধার করা হলেও ততক্ষণে তিন শিশুসহ পাঁচজনই লাশে পরিণত হয়। এর মধ্যে একজন কলেজ ছাত্রীও ছিলেন।

ঘটনাটি সে সময় দেড়জুড়ে আলোচিত হয়, কারণ ঢাকা থেকে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল প্রতিনিধিরা এসে ঘটনাটি লাইভ প্রচার করে। ওই ভবনটিতে ভাড়াটিয়া হিসেবে পাঁচটি পরিবারের ১৭ জন মানুষ বসবাস করতো। অবশিষ্ট ১২ জন প্রাণে বেঁচে গেলেও তারা সর্বস্ব খুয়ে সর্বশান্ত হয়ে পড়ে।

ঘটনার পরপরই জনরোশের মুখে জেলাপ্রশাসন থেকে তাৎক্ষণিকভাবে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। রাঙামাটি জেলাপ্রশাসক কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোয়াজ্জেম হোসাইনের নেতৃত্বাধীন এই তদন্ত কমিটিতে সদস্য ছিলেন, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ও পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী।

তদন্ত কমিটি যথা সময়েই তাদের রিপোর্ট দাখিল করে এবং সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে তা জনসমুখখে প্রকাশ করে। তদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়, ‘ভবনের মুল মালিক যে স্থানে ওই ইমারত নির্মাণ করেছেন তার কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখতে পারেননি। তিনি সরকারি খাসজমি তথা জলমহালের জমি অবৈধভাবে দখল করে এবং মহিলা কলেজের রাস্তা কেটে ভবনটি নির্মাণ করেছেন।

  • Facebook
  • Twitter
  • Print Friendly

যার কোনো ইমারত নির্মাণের অনুমোদিত নক্সা বা কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও তারা দেখাতে পারেনি। মালিক তৈয়ব কন্ট্রাক্টরের শ্যালক মইনুদ্দিন টিটু ভাড়া উত্তোলনসহ ভবনটি দেখাশোনা করেন। প্রতি্েবদনে মালিকের ৫টি অপরাধের কথা উল্লেখ করা হয়। যথাঃ অবৈধ দখল, মহিলা কলেজের রাস্তা কেটে ফেলা, ইমারত নির্মাণ অনুমোদন না থাকা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাড়া প্রদান এবং জল মহাল দখল।

প্রতিবেদনে ছয়টি সুপারিশও করা হয়, যেখানে এই করুণ মৃত্যুর জন্য ভবনের মালিক আবু তৈয়ব এবং কেয়ারটেকার হিসেবে তার শ্যালক টিটুকে দায়ী করা হয়। পাশাপাশি সম্পদহানি ও প্রাণহানির জন্য তাদের আইনের আওতায় বিচারের সুপারিশ করা হয়।
পাশাপাশি ঘটনার পুলিশ বাদি হয়ে একটি মামলাও দায়ের করে। যে এফআইআর এর সংবাদদাতা ও অভিযোগ কারী ছিল মৃত ট্রাক ড্রাইভার জাহিদের ছোটভাই লিটন। এফআইআর এ বিষয়টিকে অন্তর্ঘাত মুলক ও নরহত্যার অপরাধের ঘটনা উল্লেখ করে ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫২ সালের ১২ নং ধারা, বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫(১) ধারা সহ দন্ডবিধির ৩০৪ ধারায় মামলা রেকর্ড করা হয়।

এতো কিছুর পরও কোন রহস্যের কারণে অভিযোগপত্র থেকে তদন্ত প্রতিবেদনের মুল আসামী বাদ পড়ে গেল তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি রেজাউল করিম যাকে মুল আসামী দেখিয়ে অভিযোগপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে, ওই নামে কোনো ব্যক্তির অস্তিত্বই নেই বলে জানিয়েছে একটি সূত্র।

চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশে রেজাউল করিম নামের ওই ব্যক্তির পিতার নামের সাথে একজনের মিল খুঁজে পাওয়া গেলেও বিদেশে থাকা কল্পিত ব্যক্তির নাম রেজাউল নয় অন্য কিছু। ধারণা করা হচ্ছে বেনামি এই জমিটির বিদ্যুৎ বিল এবং পানির বিল কল্পিত নামে করা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনের সময় আইনের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে মতামত জানতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রাঙামাটি কোতয়ালী থানার উপ-পুলিশ পরিদর্শক সৌরজিৎ বড়ুয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, কাগজপত্রের ভিত্তিতে তিনি যাকে ভবনের মালিক হিসেবে প্রমাণ পেয়েছেন তাকে প্রধান আসামী এবং তার শ্যালককে সহযোগী আসামী করা হয়েছে। রেজাউল করিম নামে যাকে আসামী করা হয়েছে তাকে রাঙামাটি শহরের মহিলা কলেজ রোডে বা তার সাকিন চন্দনাইশ থানার বৈলতলী গ্রামে গেলে এলাকাবাসী ওই নামে কাউকে চিনে না বলে জানায়।

এদিকে আবু তৈয়ব ও টিটুর সেলফোন নং একাধিকবার কল করা হলেও নাম্বার দু’টি বন্ধ পাওয়া যায়। উল্লেখ্য ঘটনার পর থেকে তাদের এলাকায় দেখা যায়নি।