॥ মঈন উদ্দীন বাপ্পী ॥

রাঙামাটিতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজরিত স্থানগুলো এখনো অরক্ষিত থেকে গেছে। দেশের স্বাধীনতার ৪৮বছর পার হলেও স্মৃতিবিজরিত স্থানগুলো সংরক্ষেণে কাউকে কোন কোন ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি। স্থানীয় প্রশাসনও এর দায় কিছুতেই এড়াতে পারে না।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর মধ্যে- জেলা শহরের ‘রাঙামাটি স্টেশন ক্লাব, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এলাকা’ (পুরাতন কোর্ড বিল্ডি এলাকা),‘কাঠালতলীস্থ আলম ডক ইয়ার্ড এলাকা,’ ‘রাঙামাটি ডিসি বাংলো’, এবং ‘রাঙামাটি সরকারি কলেজ’ এসব স্মৃতিবিজরিত স্থানগুলো অযতেœ অবহেলায় পড়ে আছে।

নতুন প্রজন্মের তরুণরা এখনো এসব স্থানগুলো সম্পর্কে জানে না। মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মটা যদি পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় তাহলে এসব গুরুত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজরিত স্থানগুলো চিহ্নিত করার আরও কেউ থাকবে না। এখনি সময় এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত¦ তুলে ধরা।

রাঙামাটিতে তৎকালীন সময়ে যেসব স্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা হতো সেসব স্থানগুলো হলো-

রাঙামাটি স্টেশন ক্লাব:

রাঙামাটি জেলা শহরের আপার রাঙামাটি এলাকায় অবস্থিত ‘রাঙামাটি স্টেশন ক্লাব’। এ কøাবের মাঠে মুক্তিযুদ্ধের অস্থায়ী ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হয়েছিলো তৎকালীন জেলা প্রশাসক হোসেন তৌফিক ইমাম (এইচ.টি. ইমাম)

উক্ত ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপনে জেলা প্রশাসক এইচ.টি. ইমাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবদুস সামাদ, পুলিশ সুপার বজলুর রহমান এবং মহকুমা প্রশাসক আবদুল আলীসহ রাঙামাটির অগণিত স্বাধীনতা প্রেমিক মানুষ মুক্তিযুদ্ধের সহায়তায় এগিয়ে আসেন।

এ ক্লাবের মাঠে শুরু হয় রাইফেল ট্রেনিং এবং ছাত্রদের ককটেল বানানোর প্রশিক্ষণ। বর্তমানে ক্লাবটি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। নতুন প্রজন্মের কেউ জানে না এ মাঠে মুক্তিযুদ্ধাদের ট্রেনিং করানো হতো। ক্লাবটিতে নেই কোন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজরিত কোন ফলক।

‘রাঙামাটি ডিসি বাংলো’:

তৎকালীন রাঙামাটি জেলা প্রশাসক হোসেন তৌফিক ইমাম (এইচ.টি. ইমাম) এর নেতৃত্বে ডিসি বাংলোতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য আলোচনা সভা এবং দিক-নির্দেশনা প্রদান করা হতো।

এ বৈঠকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং ছাত্র নেতৃবৃন্দরা অংশ নিতো। বর্তমানে এটি এখনো ‘ডিসি বাংলো’ হিসেবে সবার কাছে পরিগণিত হলেও এটি যে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি রাজনৈতিক আস্তানা ছিলো তার কোন চিহ্ন নেই। কেউ জানে না মুক্তিযাদ্ধারা তাদের প্রশিক্ষণ এবং যুদ্ধ পরিচালনার জন্য যাবতীয় সিন্ধান্ত এই বাংলোতে বসে গ্রহণ করতো।

রাঙামাটি সরকারি কলেজ:

তৎকালীন রাঙামাটি জেলা প্রশাসক (ডিসি) হোসেন তৌফিক ইমাম (এইচ.টি. ইমাম) এর নেতৃতে¦ রাঙামাটি সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের সকল ক্যামিকেল ব্যবহৃত হতো বোমা বানানের জন্য। বর্তমানে কলেজটির রসায়ন বিভাগের ছাত্ররা জানেনা তারা যে ক্যমিকেল ব্যবহার করছে সেই ক্যামিকেল ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধারা বোমা তৈরি করে হানাদার বাহিনীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। বর্তমানে এ রসায়ন বিভাগের এ কক্ষটিও অরক্ষিত থেকে গেছে।

রাঙামাটি সরকারি কলেজের ক্যাম্পাসটি ছিলো মুক্তিযুদ্ধের আন্দোলনের কেন্দ্রবন্দু। এ কলেজের শিক্ষার্থীরা তখন আন্দোলন সংগ্রাম মুখরিত করতো পুরো কলেজ ক্যাম্পাস জুড়ে। বর্তমানে কলেজটি থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত কোন প্রতীক নেই।

আলম ডক ইয়ার্ড:

রাঙামাটি শহরের কাঠালতলীস্থ আলম ডক ইয়ার্ড এলাকার আলম ভবনটি ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী ক্যাম্প। এখানে স্থাপিত হয়েছিলা ওয়ারলেস সেন্টার। এখান থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা এবং চট্টগ্রামের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হত ওয়ারলেসের মাধ্যমে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার রান্না করা হত এই ডকইয়ার্ডেই। বর্তমানে এ এলাকা এবং ভবনটিও অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এলাকা:

১৯৭১ সালের ১৭ডিসেম্বর রাঙামাটিকে হানাদার মুক্ত করে জেলা শহরের পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এলাকায় বিজয়ের স্বাধীন লাল-সবুজ পতাকা উড্ডয়ন করা হয়েছিলো। এ এলাকায় সেসময় মিত্র বাহিনীর পূর্বাঞ্চল কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল সিং ওভান এবং শেখ ফজলুল হক মনি ভারতীয় হেলিকপ্টারযোগে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড মাঠে (পুরাতন কোর্ট বিল্ডিং মাঠে) অবতরণ করেন। এখানে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান, তৎকালীন ছাত্রনেতা গৌতম দেওয়ান, আবদুর রশীদ, মোঃ ফিরোজ আহম্মদ, মনীষ দেওয়ান (পরবর্তীতে কর্ণেল)সহ হাজারো ছাত্র-জনতা। যে স্থান থেকে স্বাধীন দেশের পতাকা উড্ডয়ন করা হয়েছিলো বর্তমানে সে স্থানটি অরক্ষিত রয়েছে।

বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটির সদস্য সচিব ও মুক্তিযুদ্ধের সময় অভিবক্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাবেক আহবায়ক প্রবীণ সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বাংলানিউজকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ করার জন্য আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। কিছুটা সময় লাগছে। যেকোন সময় আমরা স্মৃতি স্থানটুকু সংরক্ষণ করবো।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ রাঙামাটি জেলার কমান্ডার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রবার্ট রোনাল্ড পিন্টু বাংলানিউজকে আক্ষেপ করে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্থানগুলো সংরক্ষণের জন্য আমরা অনেক চেষ্টা চালিয়ে ছিলাম। সেসময় কারো সহযোগিতা না পাওয়ায় সংরক্ষণ করা যায়নি। স্থানীয় প্রশাসন চাইলে স্মৃতিস্থানগুলো সংরক্ষণের জন্য তৎপরতা চালাতে পারে বলে যোগ করেন কমান্ডার।

মুক্তিযুদ্ধের এ কমান্ডার আরও বলেন, আমাদের দু:খ রাঙামাটিতে এখনো গণ কবর সনাক্ত করতে পারিনি। সনাক্তের জন্য তিনিও চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানান।