॥ মঈন উদ্দীন বাপ্পী ॥

শিক্ষায় পিছিয়ে পাড়া পাহাড়ি জেলা রাঙামাটির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো এখনো শিক্ষক সংকটে ভুগছে। প্রধান শিক্ষক শূন্য পদগুলোতে সহকারি শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদান যেমন ব্যাহত হচ্ছে তেমনি মান বাড়ছে না লেখা-পড়ার।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা  জানায়, জেলায় মোট ৭০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সরকারী এসব বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিদ্যালয় ৮৬টি, ১৯টি কিন্ডার গার্ডেন, কমিউনিটি বিদ্যালয় ০১টি, রেজিস্ট্রেশন বিদ্যালয় ০২টি, এনজিও ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ০৬টি, এবতেদায়ী (স্বতন্ত্র) ০৮টি, এবং ১২টি উচ্চ মাদ্রাসা রয়েছে।

এর মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে ১৫১টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা অতিরিক্ত ভাবে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ২৫২জন সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। তবে ২০১৯ সালে ১২৪জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে জেলা পরিষদ। নিয়োগকৃত শিক্ষকদের তাদের কর্মস্থলে পাঠানো গেলে শিক্ষক সংকট কিছুটা লাগব হবে বলে জানান তারা।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানায়, এইবারে স্কুলগুলোতে বালকের সংখ্যা হলো ৩৯হাজার ৬৯৬জন এবং বালিকার সংখ্যা হলো- ৪১হাজার ৩১২জন। তবে বালকের তুলনায় বালিকার সংখ্যা বেড়েছে। ২০২০ সালে ঝড়ে পড়া শিক্ষাার্থীর সংখ্যা নির্ণয় করা না গেলেও ২০১৯ সালে ঝড়ে পড়েছে ১২.৯২% শিক্ষার্থী। নানা কারণে এসব শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়ছে বলে তারা মত ব্যক্ত করেন।

তারা বলেন, শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি প্রশাসনিক আরও কিছু পদ খালি রয়েছে। এর মধ্যে-উচ্চমান সকারী পদে অনুমোদিত রয়েছে ১২টি পদ। কিন্তু কর্মরত রয়েছে ৮টিতে। অফিস সহকারী পদে অনুমোদিত আছে ১২টি। কর্মরত রয়েছে ০৭টিতে। সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও) পদেও খালি রয়েছে। অনুমোদন আছে ২০টিতে। কর্মরত রয়েছে ১৭টিতে।

পরিক্ষায় ১২হাজার ৯৮৭জন পরিক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছে পাস করেছে ১২হাজার ৭৫২জন। পাশের হার ৯৮.১৯। ইবতেদায়ী মাদ্রাসায় ৫৩৩জন পরিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। পাশ করেছে ৫৩২জন। পাশের হার ৯৯.৮১। ছয় হাজার ১১৬ বর্গ কিলো মিটারের, চার লক্ষ ৪৯হাজার ৩৩৬জন বসবাসকারী লোকের পাহাড়ি জনপদে শিক্ষার হার মাত্র ৪৯.৭০%।

সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, চলতি বছরের প্রথম দিনে রাঙামাটির চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের মধ্যে ২০২০ শিক্ষাবর্ষে ৬৭ হাজার ৭০৮টি বই বিরতণ করা হয়েছে।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে ২০১৭ সালে প্রাক-প্রাথমিক শিশুদের স্ব- স্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে প্রথম শ্রেণি, ২০১৯ সালে দ্বিতীয় শ্রেণি ও ২০২০ সালে তৃতীয় শ্রেণিতেও বই পেয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিশুরা। ২০২০ সালে ৩০ হাজার ৭৪৪ জন শিক্ষার্থীর মাঝে বিতরণ করা হবে ৬৭ হাজার ৭০৮টি বই।

প্রাক-প্রাথমিকে ১৭ হাজার ৯৪০টি, প্রথম শ্রেণিতে ১৯ হাজার ৩৫০টি বই বিতরণ করা হবে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২২ হাজার ৬৪১ টি বই বিতরণ করা হবে। তৃতীয় শ্রেণিতে ৭ হাজার ৭৭৭টি মাতৃভাষার বই বিতরণ করা হয়েছে।

এর আগে ২০১৯ শিক্ষাবর্ষে জেলায় মাতৃভাষায় মোট ৮৩ হাজার ৫০৯টি বই বিতরণ করা হয়। এবার বইয়ের সংখ্যা কমেছে। শিক্ষার্থী কম হওয়ার কারণে বইও কম বলে জানান সংশ্লিষ্টরা ।

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি, রাঙামাটি সদর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মঙ্গল বাহাদুর ছেত্রী বলেন, ‘মাতৃভাষায় বই দেওয়ায় সরকার ভাল উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির শিশুরা আগে মাতৃভাষার অক্ষরও চিনতো না। এখন তারা মাতৃভাষার অক্ষর চিনতে পারছে, পড়তে ও লিখতে পারছে। এতে করে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিশুরা নিজেদের ভাষাকে রক্ষা করতে পারবে।’

চাকমা ভাষার প্রশিক্ষক প্রসন্ন কুমার চাকমা বলেন, ‘এখনও ভালো করে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শেষ হয়নি। এরপরও এবার তৃতীয় শ্রেণির কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। ভাল প্রশিক্ষণ না হওয়ায় অনেক শিক্ষক এখনো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির বইগুলো পড়াতে পারছে না। এজন্য মাতৃভাষার পাঠদান শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করাতে হবে এবং পরিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার মান বাড়াতে বাড়াতে হবে।

রাঙামাটি সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ত্রিরতন চাকমা জানান, পৌর এলাকায় ২৬টিসহ সদর উপজেলায় ৮৯টি বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিকে চাকমা ৯৪৪, মারমা ২৬ ও ত্রিপুরা ভাষায় ১৫৩ টি বই পাওয়া গেছে। প্রথম শ্রেণিতে চাকমা ১০৬২টি, মারমা ২৫ টি ও ত্রিপুরা ভাষায় ৩৫ টি বই। দ্বিতীয় শ্রেণিতে চাকমা ১১৩২ টি, মারমা, ৩২ ও ত্রিপুরা ভাষায় ৩৪ টি বই এবং তৃতীয় শ্রেণিতে চাকমা ভাষায় ১১১৪টি, মারমা ৪৩ ও ত্রিপুরা ভাষায় ৫৪টি বই বিদ্যালয়গুলোতে পাঠানো হয়েছে। ১ জানুয়ারি শিশুদের হাতে দেওয়া হয়েছে এইসব বই।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. খোরশেদ আলম বলেন, আমাদের এখনো প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক সংকট রয়েছে। সহকারী শিক্ষক রাঙামাটি জেলা পরিষদ নিয়োগ দিতে পারলেও প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে। তবে সরকার আন্তরিক হলে শিক্ষক সংকট দূর হয়ে যাবে।

শিক্ষা কর্মকর্তা আরও বলেন, রাঙামাটি একটি দূর্গম জেলা। দূর্গম এলাকাগুলোতে পাঠদান চালানো সত্যিই কষ্টকর। ওইসব এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকরা যেতে চান না। কারণ তাদের থাকার মতো কোন আবাসন ব্যবস্থা নেই। সরকারের কাছে আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি এসব দূর্গম অঞ্চলগুলোতে শিক্ষকদের থাকার জন্য আবাসন ব্যবস্থা করে দেওয়ার।

শিক্ষা কর্মকর্তা খোরশেদ জানান, ‘মাতৃভাষায় পাঠদানে আমরা শতভাগ সফল এ কথা বলা যাবে না। তবে আমরা ৬০ভাগ সফল। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত শিক্ষার্থীরা তাদের মাতৃভাষায় লেখা-পাড়া করতে পারছে এটাই তো বড় পাওয়া। তবে ভাল ভাবে মাতৃভাষায় পাঠদানের জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখা হয়েছে বলে যোগ করেন শিক্ষা কর্মকর্তা।