মঈন উদ্দীন বাপ্পী । হিলরিপোর্ট

দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির সন্তানদের কথা ভেবে বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার ২০১৫সালের ১০জানুয়ারী থেকে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিটে চারটি ব্যাচের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর স্থানীয় পাহাড়ী সংগঠনগুলোর বাধার মুখে পড়ে।

মেডিকেল কলেজ চালুর ব্যাপারে তৎকালীন সময়ে ছাত্র-জনতা তুখোর আন্দোলন গড়ে তোলে। আন্দোলন করতে গিয়ে নানিয়ারচর উপজেলার যুবলীগের কর্মী মনির হোসেন পাাহাড়ি সন্ত্রাসীদের আক্রমণে মারা যান।

মনিরকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে রাঙামাটি সদর হাসপাতাল পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ওই বছরের ১৭জানুয়ারী শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহীদ মনিরের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি তার পরিবারবর্গের একজনকে চাকরী দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু ঘটনার এত পার হলেও শহীদ মনিরকে কেউ মনে রাখেনি। কেউ খোঁজ রাখেনি তার পরিবারবর্গের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে শহীদ মনিরের পরিবারের জন্য পাঁচ হাজার টাকা বরাদ্ধ করা হয়েছিলো। যা এখনো তার পরিবার পেয়ে যাচ্ছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কথা দেওয়া শহীদ মনিরের পরিবারের কারো এখনো সরকারি চাকরী হয়নি।

এদিকে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি ছিলো- রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের জন্য মনির আন্দোলন করতে গিয়ে শহীদ হয়েছে। তাই তার নামে একটি ছাত্রাবাসের নামকরণ করা হোক। বর্তমানে রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের মেয়াদ ষষ্ঠ বছরে পদার্পণ করেছে। এখনো রাঙামাটিবাসীর দাবি পূরণ হয়নি। রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ থেকে

এমবিবিএস শেষ করেছে ১ম ও ২য় ব্যাচের ৯০ শিক্ষার্থী; ব্যাচের ৪৫ শিক্ষার্থী এখন ইন্টার্নি করছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। দ্বিতীয় ব্যাচের ৪৫ শিক্ষার্থীরও এমবিবিএস শেষ পর্যায়ে। যারা আজ ডাক্তার হয়ে হয়ে বের হচ্ছে তারা তো মনিরের আত্মত্যাগের আন্দোলনের মাধ্যমে ডাক্তার হতে পেরেছে। এসব ডাক্তাররা কি মনিরের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ রাখবে? প্রশ্ন স্থানীয় সচেতন মহলের।

শহীদ মনিরের মা কমলা বেগম বলেন, আমরা আমার ছেলে কথা কি করে ভুলবো। তার রেখে যাওয়া একটি কন্যা সন্তান আমার ছেলের স্মৃতি বহন করছে। আমি তো আর আমার ছেলেকে ফিরে পাবো না।

তিনি আরও বলেন, আমার একটাই দু:খ, আমার ছেলেটা আমার সংসারের আয়ের চাকা ঘুরাতো। এখন সে নেই। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো আমার পরিবারের একজনকে একটি সরকারি চাকরি দেওয়া হবে। কিন্তু চাকরী তো দূরের কথা আমাদেরকে কেউ মনে রাখেনি।

শহীদ মনিরের ছোট ভাই মোস্তাফা কামাল বলেন, আমি ভাই হারিয়েছি। যে ভাই হারায় সে বুঝে ভাই হারানোর যন্ত্রণা কতটুকু। আমার ভাইয়ের হত্যাকারীদের এখনো কোন বিচার হয়নি।

তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো- আমাদের পরিবারের একজনকে একটি সরকারি চাকরী দেওয়া হবে। কিন্তু আমাদের পরিবারের কেউ কোন চাকরী পায়নি। কেউ আমাদের মনে রাখেনি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আমি রাঙামাটি সরকারি কলেজে স্নাতক প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত আছি।

শহীদ মনিরকে নিয়ে আন্দোলন করা তৎকালীন ছাত্রনেতা এ্যাডভোকেট মো. মামুন ভূঁইয়া বলেন, আমার এক দাবি; যেহেতু রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য মনির হোসেন শহীদ হয়েছেন। তাই তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং তাকে পরবর্তী প্রজন্ম মনে রাখতে তার নামে মেডিকেল কলেজের একটি ছাত্রাবাসের নামকরণ করা হোক।

রাঙামাটি প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার আল হক বলেন, আজ মেডিকেল কলেজ ষষ্ঠ বছরে পদার্পণ করেছে। অনেক ডাক্তার পাস করে বের হয়েছে। কিন্তু যাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে এ মেডিকেল কলেজেরে পথচলা তাদের স্মরণ না রাখলে আমরা মানুষের পরিচয় বহন করি না। নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটবে। তাই সরকারের কাছে দাবি জানায়, যারা আত্মত্যাগের কারণে মেডিকেল কলেজ, তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাকে স্মরণীয় রাখতে একটি ছাত্রাবাসের নামকরণ করা হোক।

রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক ও সাবেক ছাত্রনেতা জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলেন, দু:খ আমাদের। আমরা এ মেডিকেল কলেজটি প্রতিষ্ঠার জন্য কত কষ্ট করেছি, ঘাম জড়িয়েছি। কিন্তু আমাদের কথা কেউ মনে রাখে না।

সাবেক এ ছাত্রনেতা আরও বলেন, মনির নামের একটি ছেলে সেইদিন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলনে রাজপথে নেমেছিলো এবং সন্ত্রাসীদের আক্রমণে শহীদ হন। কিন্তু মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে স্মরণ করেনি কোনদিন। তাকে শ্রদ্ধা জানায়নি। তাই অবিলম্বে একটাই দাবি মেডিকেল কলেজের একটি ছাত্রবাসের নাম হবে ‘শহীদ মনির’।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ বলেন, অতীতের জেলা প্রশাসকের মতো আমিও মনিরের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাসিক পাঁচাহাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করছি।

তিনি আরও বলেন, দু:খের বিষয় মনিরের ভাই এসব টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে নিজের কাজে লাগায়। তাই আমি মনিরের মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তার ব্যাংক একান্টে টাকাগুলো ডিপোজিট করে দিয়েছি। যাতে মেয়েটা এসব টাকা তার পড়ার কাজে লাগাতে পারে।

রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রীতি প্রসুন বড়ুয়া বলেন, শহীদ মনিরের বিষয়টির ব্যাপারে মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ অবগত আছেন। কলেজে দু’টি অস্থায়ী ছাত্রাবাস রয়েছে। যদি স্থায়ী ছাত্রাবাস গড়ে তোলা হয় তাহলে একটি ছাত্রাবাসের নামকরণ করা হবে ‘শহীদ মনির’

বছর পর বছর, দিনের পর দিন পার হলেও এখনো বিচার হয়নি রাঙামাটি ম্যাডিকেল কলেজ চালুকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত মনির হোসেন হত্যার।

২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারী রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ চালুর আনন্দ শোভাযাত্রায় উপজাতিয় সন্ত্রাসীদের হামলায় নির্মমভাবে খুন হয় মনির হোসেন। তার আত্মত্যাগের বিনিময়ে রাঙামাটিতে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ বছরেও সে হত্যার বিচার হয়নি। তার সে অবদানের কথা আজ কারো মনে নেয়। মনিরের পরিবারকেও দেওয়া হয়নি সরকারের পক্ষ থেকে কোন সুযোগ সুবিধা। তাই মনিরের অবদানকে স্মরনীয় করে রাখার জন্য মেডিকেল কলেজের ছাত্রবাসকে শহীদ মনিরের নামে নামকরণ করাসহ তার পরিবারকে সরকারি চাকরি দেওয়াও এখন সময়ের দাবি।

মেডিকেল কলেজের আজ ৬ষ্ঠ বছরে না রাখায় তাই জেলার সুশীল সমাজের মানুষেরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের দাবি অনতিবিলম্বে কলেজের ছাত্রবাসকে শহীদ মনিরের নামে নামকরণ করাসহ তার পরিবারকে সরকারি চাকরি দেওয়া।