মঈন উদ্দীন বাপ্পী, হিলরিপোর্ট

রাঙামাটি: রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার দুর্গম ইউনিয়নের নাম বুড়িঘাট।এই ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বাজারের নাম ‘বুড়িঘাট বাজার’। ১৯৫৮সাল থেকে বাজারটি তার ঐতিহ্য ধরে রেখে জমজমাট ব্যবসা করেছিলো। সারি সারি নৌকা, বোট, লঞ্চ, ইস্টিমারের আওয়াজে মুখরিত থাকতো চেঙ্গী নদীর কোল ঘেষে গড়ে উঠা বাজারটি। পুরো দিন ব্যস্ত থাকতো হাট-বাজারটি।

সন্ধ্যার নামার সাথে সাথে কুপি এবং হ্যাজাকের আলোয় চায়ের দোকানগুলোতে ব্যবসায়ীদের রমরমা আড্ডা চলতো চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে। ওহ, হ্যা, বলে রাখা ভাল, এই বাজারটিতে এখনো বিদ্যুতের আলো পৌছায়নি।

এক সময় জেলা ও জেলার বাইরে থেকে ব্যবসায়ীরা এই হাট বাজারে এসে ব্যবসা করতো। বাজারটি দীর্ঘ দুই যুগ ধরে বন্ধ থাকায় ভূতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বাজারটির স্থায়ী দোকান-পাট এবং বাজার সেটগুলো ভেঙ্গে পড়েছে। বাজারে কোন ব্যস্ততা নেই, নেই কোন ক্রেতা। দু’-চারটি যে দোকান আছে তারা এলাকার প্রতি মায়ার টানে নামে মাত্র বিকিবিনি করে সংসারের চাকা ঘুরাচ্ছে কোনরকমে।

সরেজমিনে গেলে স্থানীয় প্রশাসন এবং স্থায়ী বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শান্তি চুক্তির আগে ১৯৯৩সালে ১৭নভেম্বর সকালে একদল সশস্ত্র পাহাড়ি সন্ত্রাসী বুড়িঘাট ইউনিয়নের বাঙ্গালী বাসিন্দাদের উৎখাতের দাবিতে হামলা পরিচালনা করে। ওইদিন রাতে বাঙ্গালী জনগণও তাদের জীবন বাঁচাতে ওই হামলার প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

পরবর্তী সময়ে পাহাড়ি জনগগোষ্টির পক্ষ থেকে ১৪৪জন বাঙ্গালীকে আসামী করে আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলা হওয়ার পর থেকে পুরো গ্রামের বাঙ্গালী পরিবারগুলো পুরুষ শূন্য ছিলো। চট্টগ্রাম বিভাগীয় আদালতে মামলাটি খারিজ হলে ১৯৯৫সাল থেকে এলাকায় কিছুদিন শান্তি পরিবেশ সৃষ্টি হলেও বাজারটি আর জমে উঠেনি।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কয়েকবছর চেষ্টা করেছিলো ব্যবসা কেন্দ্রটির ঐতিহ্য ধরে রাখার। তৎকালীন শান্তি বাহিনীর বিশাল অংকের বাৎসরিক চাঁদার মুখে ব্যবসা করা বন্ধ করে দেয় ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয় প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বারবার চেষ্টা করেছিলো বাজারটি চালু করতে। শান্তিবাহিনীর ভয়ে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে রাজি না হওয়ায় অবশেষে ১৯৯৭সাল থেকে বাজারটি স্থায়ী ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, এক সময় এলাকাটি শান্তিবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করলেও শান্তি চুক্তি পরবর্তী বর্তমানে এলাকাটি ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুফ নিয়ন্ত্রণ করছে। শসস্ত্র সংগঠনটি এই এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মূলত চাঁদা আদায় করছে দীর্ঘ বছর ধরে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. হিরু মিয়া বলেন, আমি এই এলাকায় দীর্ঘ ৪২বছর ধরে বসবাস করছি। অনেক কিছু আমার চোখের সামনে হয়েছে। অনেক কিছুর স্বাক্ষী। ব্যবসা নেই; তারপরও এলাকার টানে এখনো বাস করছি।

আরেক স্থানীয় মো. মোস্তফা, মো. শাহীন, টিটু সরদার, আইনাল হক, হারুন, ফারুক এবং সুরুজ আলী সকলের একটাই দাবি, বুড়িঘাট বাজারে তার ঐতিহ্য ফিরে আসুক। আবার ব্যবসায়ীদের রমরমা আড্ডা জমে উঠুক।

নানিয়ারচর উপজেলা আ’লীগের সভাপতি আব্দুল ওয়াহাব হাওলাদার জানান, বাজারটি খোলার ব্যাপারে আমরা অনেকবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু প্রসীত গ্রুফের ইউপিডিএফ যে হারে চাঁদা দাবি করছে তা ব্যবসায়ীদের পক্ষে কোনদিন পূরণ করা সম্ভব নয়।

নানিয়ারচর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিউলী রহমান তিন্নী বলেন, বাজারটি বিষয়ে আমার তেমন জানা নেই। তবে যদি বাজার বন্ধ থাকে তাহলে সকলকে নিয়ে খোলার চেষ্টা করবো।

নানিয়ারচর উপজেলার চেয়ারম্যান প্রগতি চাকমা বলেন, আমি এই এলাকার স্থানীয় সন্তান। বাজার বন্ধ থাকার বিষয়টা আমাকে কষ্ট দেয়। আমি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে দাবি করছি, বাজারটিতে তার হারারো গৌরব ফিরে আসুক।

তিনি আরও বলেন, আমি একা চাইলে হবে না। এইজন্য স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তি, স্থানীয় প্রশাসন সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে।