মঈন উদ্দীন বাপ্পী । হিলরিপোর্ট

রাঙামাটি: নতুন বছর উঁকি দিচ্ছে। ২০২১ বিদায় নিচ্ছে। সব হানা-হানি বন্ধ হবে। সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের স্বার্থে এক হয়ে কাজ করবে। নতুন বছরে শান্তির সুবাতাস ছড়িয়ে পড়বে পার্বত্য জনপদে এমন প্রত্যাশা পার্বত্যবাসীর।

২০২১ সালে আলোচিত হত্যার ঘটনা:

বছরের শুরুতে ২৪ ফেব্রুয়ারি দুপুরে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় দিনদুপুরে সরকারি অফিসের ভেতরে ঢুকে রূপকারি ইউনিয়ন পরিষদের এক নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার সমর বিজয় চাকমাকে (৩৮) গুলি করে হত্যা করার মধ্য দিয়ে রাঙামাটিতে রক্তপাতের ঘটনার সূচনা হয়।

এরপর একই উপজেলায় ৩০ মার্চ জেএসএস এমএন লারমা গ্রুপের সামরিক কমান্ডার বিশ্ব চাকমা ওরফে যুদ্ধ চাকমাকে (৪২) তার সহকর্মী সুজন চাকমা গুলি করে হত্যা করেন।

৮ জুলাই রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার দুর্গম রাইখালী ইউনিয়নের নারানগিরি বড়পাড়া এলাকায় জেএসএস সন্তু গ্রুপের সঙ্গে এমএনপি গ্রুপের গুলিবিনিময়কালে একজন নিহত হন।

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় ১৭ সেপ্টেম্বর ভোরে একদল সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে নিহত হন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সশস্ত্র নেতা সুরশে কান্তি চাকমা ওরফে দীনেশ চাকমা।

১৬ অক্টোবর রাতে কাপ্তাই উপজেলার চিৎমরম ইউনিয়নের আগাপাড়া এলাকায় নেথোয়াই মারমা (৬০) নামে আওয়ামী লীগের এক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান প্রার্থীকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।

২৬ অক্টোবর রাতে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার কাপ্তাই ইউনিয়নের নতুন বাজার এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে সজিবুর রহমান (৪৫) নামে কাপ্তাই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের এক মেম্বার (সদস্য) নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন ২০ জন।

৩০ নভেম্বর ভোরে রাঙামাটি সদর উপজেলার বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়নের কিচিং আদম এলাকায় ঘরে ঢুকে রাঙামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র এরিয়া কমান্ডার আবিষ্কার চাকমাকে (৪০) গুলি করে হত্যা করে প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসীরা। নিহত ব্যক্তি সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পিসিজেএসএসের হয়ে লংগদু, নানিয়ারচর এবং বরকল উপজেলার সুবলং ইউনিয়নের এরিয়া কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

বুধবার (২৯ নভেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাঘাইছড়ি উপজেলার রূপকারী ইউনিয়নের দুইকিলো নামক স্থানে পাহাড়ের দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের সংঘর্ষে দু’দলের দু’জন নিহত হয়েছেন।

নিহতরা হলেন- গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্য জানং চাকমা (৩৮) ও জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্য মনিময় চাকমা (৩৫)। এ ঘটনায় আহত হন মো. মনু নামের এক যুবক। তার পায়ে দু’টি গুলি লাগে।

আলোচিত রাজনৈতিক ঘটনা:

বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিলো- পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি সাবেক গেরিলা নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা (৭৭) এ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণ করেননি। অংশ নেননি বাংলাদেশের কোনো জাতীয় অনুষ্ঠানে। তবে এবার তাকে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) তার মান ভাঙাতে সফল হয়েছে।

জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া ভ্যাকসিন নিতে পারছিলেন না সন্তু লারমা। যে কারণে বিদেশ ভ্রমণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে আটকে যাচ্ছিলেন তিনি। ফলে ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও অবেশেষে নিজেকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করালেন। চলতি বছরের ২৯ আগস্ট রাঙামাটি জেলা নির্বাচন অফিসে গিয়ে চরম গোপনীয়তায় নিজেকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে ছবি তোলাসহ আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করেন তিনি। মূলত জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া করোনা টিকা নিতে না পারায় তিনি এ আবেদন করেন।

বছরের আরেকটি রাজনৈতিক আলোচিত ঘটনা ছিল- ১৫ নভেম্বর রাতে রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার ২ নং গাইন্দ্যা ইউনিয়নের তাইতংপাড়ায় আলোচিত মিয়ানমারের নাগরিক ডা. রেনিন সোকে (৫৩) গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালায় সন্ত্রাসীরা। ডা. রেনিন সো এ ঘটনার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সন্তু গ্রুপের সন্ত্রাসীদের দায়ী করেছেন।

ডাক্তার রেনিন সো মিয়ানমারের নাগরিক। তিনি অনেক বছর ধরে রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার ২ নম্বর গাইন্দ্যা ইউনিয়নের তাইতংপাড়ার রাজস্থলী সরকারি কলেজ সংলগ্ন এলাকায় বিবাহ সূত্রে নিজে বাড়ি করে বসবাস করছেন। তিনি একজন নিউরোসার্জন। স্থানীয়দের চিকিৎসাসহ নানা মানবিক কাজে জড়িত রয়েছেন তিনি। মিয়ানমারের আরাকান আর্মির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এর আগে আটক করেছিল এবং তার হাজতবাস হয়েছিল।