\ আবু নাছের, বাঘাইছড়ি \

টগবগে উঠতি তরুণের নাম আল আমিন। স্বপ্ন ছিলো সেনাবাহিনীর সদস্য হওয়া। কিন্তু এ তরুণের স্বপ্নটা অধরা রয়ে গেলো। আল আমিনের বাবা-মা দু’জনেই আনসার ভিডিপি’র সদস্য। ঘরে অর্থের অভাবের কারণে বাবা-মা’র মতো তিনিও নাম লেখান আনসার সদস্যর খাতায়

সেই দূরন্তপনা দু:সাহসী তরুণের চাকরিতে নাম লেখার পর নির্বাচনী কাজে প্রথম অভিযানের ডিউিটি পওে সাজেক ইউনিয়নের কংলাক সঃপ্রাঃ বিদ্যালয়ে। জীবনের প্রথম বাহিনীর পোশাক গায়ে সবার চাইতে একটু আলাদা উৎসাহ উদ্দিপনা নিয়ে সে গিয়েছিলো ভোট কেন্দ্র পাহাড়া দিতে।

সারা দিন পাহাড়াও দিয়েছে সাহসী সেই তরুণটি। কিন্তু ফেরার পথে মারিশ্যা দিঘিনালা সড়কের ১১ কিলো নোয়া পাড়া এলাকায় তার ও তার সফর সঙ্গীদের জন্য আগে থেকেই ওৎ পেতে ছিলো কিছু পাহাড়ি বিপথগামী আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী। সন্ধার আবচা আলো আধারে এগিয়ে যাচ্ছিলো নির্বাচনের দায়িত্ব শেষ করা চারটি গাড়ি।

সামনে নিরাপত্তার জন্য বিজিবি স্কোয়াড পিকাপ, পেছনে তিনটি চান্দের গাড়ি। আল আমিন ছিলো সামনে থেকে ৩য় গাড়ির ছাদে। ওৎ পেতে থাকা জায়গার সামনে দিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই গর্জে ওঠে পাহাড়ি হায়নাগুলোর সংক্রিয় অস্ত্রগুলি। গাড়ি বহর লক্ষ করে বৃষ্টির মতো ছুটে আসতে থাকে গুলি। ছাদে থাকায় খুব সহজেই গুলির নিশানায় পরিনত হয় সে।

সাথে সাথে আক্রান্ত হয় তার অন্যান্য সফর সঙ্গীরাও। সাহসী ও বুদ্ধিমান চান্দের গাড়ির চালকেরা পরিস্থিতি বুঝতে পেড়ে শক্ত হাতে সর্বোচ্চ গতিতে গাড়ি ছোটাতে চেষ্টা করে। এদের একজনের গায়ে লাগে গুলি। কিন্তু সে থেমে যায় নি। সাধ্যমতো জীবন নিয়ে ছোটার চেষ্টা করেছে সেও।

কিন্তু ইতমধ্যেই রক্তের ফোয়ারায় ভেসে গেছে পিচ ঢালা পথ। মৃত্যু আতংকে চিৎকারে সাহায্যের প্রার্থনা। তখন একমাত্র সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ ছাড়া বাঁচার কোনো উপায় ছিলোনা তাদের। এই হামলায় ৭ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হন। সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ ছিলো বলেই বেঁচে যান বাকিরা।

বাঘাইছড়ি উপজেলা স্বাস্থকমপ্লেক্সে আল আমিনের নিথর দেহ নামানো হয় গাড়ির ছাদ থেকে। যে দেহটাকে একটু লম্বা করার জন্য ঘরের ভিতরে সে ঝুলিয়েছিলে রিং। সেই দেহের সব রক্ত আজ রাস্তায় ঝরে গেল।

ঘরের বাশের বেড়ায় বিভিন্ন মানচিত্র। ফেইসবুক প্রোফাইলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কভার পিকচার। নিয়মিত সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পোস্ট শেয়ার করতো সে। সে মন থেকেই ভালোবাসতো সেনাবাহিনীকে।

আল আমিন স¦প্ন দেখতো একদিন সেও কম্বেক্ট পোশাকে অন্যদের মতো পাহাড়ের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু যাদের হাত থেকে সে পাহাড় রক্ষার স¦প্ন দেখতো সেই পাহাড়ি সন্ত্রাসীর গুলিতেই তার স¦প্ন হারিয়ে গেলো অন্ধকারে।এভাবেই পাহাড়ে ঝড়ে পরে হাজারো তরুনের সংগ্রামের সপ্ন। আমাদের কি কিছুই করার নাই?

আল আমিন এর মা ছেলের কথা বলতে বলতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তিনি বলেন ‘আল আমিন এর স্বপ্ন আছিল পোলায় আর্মী অইবো পোলা কইতো মা সেনাবাহিনীতে আমার আরেকটু লম্বা অইত অইবো, আমারে দুইটা রিং কিন্না দেও। আমি কিন্না দিছে অই ঝুলতো।

ফেইসবুকে সবসময় আর্মি গো ছবি ছাড়তো আর রুমের ভিতর ম্যাপ টাঙাইয়া রাখতো আর কইতো মা আমি সেনাবাহিনীর চাকরি হইলে তোমার আর অভাব থাকবো না। ’

আল আমিন এর বাবা শোকে পাথর কতা বলতে পারছে না তারপরও কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন, ‘আমি ছেলে হত্যার বিছার পাব না মনে হয় কারণ আজ পর্যন্ত পাহাড়ে কোন হত্যার বিচার হয়নি আমার ছেলেরটা ও হবে না। এই পাহাড়ে সেনাবাহিনী দিলে হয়তো অনেক বাবা মায়ের বুক খালি হবে না।

আল আমিনের এই অপমৃত্যুতে তার বন্ধুরা চরমভাবে শোকাহত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যেমে তারা তাদের বন্ধুকে এভাবে হারিয়ে ফেলায় মর্মাস্পর্সী স্টাটাস দিচ্ছে। একজন বলেন সে আমাদের অনেকের অনুপ্রেরণা ছিলো। আমরা তার কাছ থেকে দেশকে ভালোবাসার শিক্ষা পেয়েছি। বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে সে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতো। তার মৃত্যুতে পরিবারের সাথে সাথে পুরো বাঘাইছড়ি আজ শোকাহত………..