॥ মঈন উদ্দীন বাপ্পী ॥

অবশেষে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্টের ফ্লোরিডার লঞ্চপ্যাড থেকে শুক্রবার (১১ মে) বাংলাদেশ সময় দিনগত রাত ২টা১২ মিনিটি উৎক্ষেপন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় বিকেল ৬টা ২৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টা ২৫ মিনিট) বঙ্গবন্ধু-১ গাজীপুরে ও রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় গ্রাউন্ড স্টেশনে সংকেত পাঠায়

শনিবার (১২ মে) দুপুরে তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক নিজের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে লাইভে এসে এ কথা জানান। তিনি জানান, কক্ষপথে এটি সুস্থির হতে আরও ১১ দিন সময় লাগবে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেলে বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১২মিনিটে পৃথিবীর কক্ষপথের উদ্দেশে যাত্রা করে বঙ্গবন্ধু-১। উৎক্ষেপণের প্রায় ৩৩ মিনিট পর স্যাটেলাইটটি ফ্যালকন ৯ রকেটের দ্বিতীয় অংশ থেকে আলাদা হয়ে জিওস্টেশনারি অরবিটের (কক্ষপথ) অভিমুখে এগিয়ে চলে। আর উৎক্ষেপণের পর ৩৬ মিনিটের মধ্যেই স্যাটেলাইটটি সফলভাবে নির্ধারিত কক্ষপথে চলে যায়।

প্রথম বছর বঙ্গবন্ধু-১ পরিচালনা করবে এর নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান থালেস আলেনিয়া স্পেস ফ্যাসিলিটি। এর কক্ষপথ ভাড়া দিয়েছে রাশিয়া।

বাংলাদেশের হাতে এর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আসতে তিন বছর সময় লাগবে। স্যাটেলাইটটি ১৫ বছর কর্মক্ষম থাকবে। তবে আরও তিনবছর এটি কাজ করতে সক্ষম থাকবে বলে জানিয়েছন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটটি নিয়ন্ত্রণে রাঙামাটির বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ আগেই সম্পন্ন প্রস্তুত রয়েছে। এজন্য ভূ-উপগ্রহটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দ্বারা ঢেলে সাজানো হয়েছে। ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রটির প্রাইমারি গ্রাউন্ড ষ্টেশনটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়।

প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা সাথে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন যুদ্ধ বির্ধস্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ হাতে উদ্বোধন করেছিলেন বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রটি। সে সময় একটি সদ্য স্বাধীন প্রাপ্ত দেশের তথ্য প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং স্বাধীন দেশে স্বাধীন ভাবে তথ্য প্রযুক্তির উন্নত যোগাযোগ স্থাপনের জন্য চালু করা হয় দেশের প্রথম এই ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রটির।

১৯৭০ সালে এই কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শুরু হলেও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে এই কেন্দ্রটিকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার এবং কেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ রাখার নানান চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু জাতির জনকের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে এই কেন্দ্রটির কাজ অব্যাহত থাকে।

তদানীন্তন পার্বত্য চট্টগ্রাম বর্তমানে রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া নামক স্থানে রাঙামাটি চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশ্ববর্তী এলাকায় ১২৮ একরের জায়গার উপর স্থাপিত এই কেন্দ্রটি ৩৫,৯০০ কিলোমিটার উর্ধাকাশে অবস্থিত কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে দ্রুততার সাথে তথ্য আদান প্রদানের কাজ পরিচালিত হচ্ছে এ কেন্দ্র থেকে।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মিত্র শক্তি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জাতির জনককে ভারতের ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্য প্রযুক্তির কাজ সম্পাদনের কথা বললেও সেই সময় জাতির জনক এই আহবান বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করে নিজ দেশে স্বাধীনভাবে তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের সুদূর প্রসারী চিন্তা ভাবনার মাধ্যমেই স্বাধীন দেশে এই ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রটি চালু করেন।

তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারের নৃশংসভাবে হত্যার পর ক্ষমতায় আসীন পরবর্তী স্বৈরাচারী সরকার এবং ১৯৯০ -এর পরবর্তীতে দু’দফায় দেশ পরিচালনায় এসে বিএনপি জামাত জোট সরকার বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত এই ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রটিকে কার্যত অচল করে দেয় বলে অভিযোগ করেছেন এই কেন্দ্রের সিবিএ নেতৃবৃন্দ। তাদের আশা জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের আমলেই ভূ-উপগ্রহটি নুতন করে প্রাণ সঞ্চার ফিরে পেলো।

এদিকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ ৪৩বছর পর আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে পাহাড়ের অবহেলিত দেশের প্রথম ভূ- উপগ্রহ কেন্দ্রটিতে। এলাকার বেকারত্ব লাঘবে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখার সম্ভাবনা তৈরী হবে প্রতিষ্ঠানটি থেকে এমন ধারণা স্থানীয় বাসিন্দাদের।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনকে কেন্দ্র করে রাঙামাটিতে আনন্দের জোয়ার বইতে শুরু করেছে। আনন্দে মাতহারা সাধারণ মানুষ বলছে আমাদের এলাকার ভূ-উপগ্রহটি থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণ করা হবে যা আমাদের জন্য সৌভাগ্যর ব্যাপার। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি রাঙামাটির ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র ছাড়াও গাজীপুরের জয়দেবপুর ভূ উপগ্রহ থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।