॥ মঈন উদ্দীন বাপ্পী ॥

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গম সাজেক ইউনিয়নটিকে প্রকৃতির কাশ্মীর বলা হয়। এর সৌন্দর্য অবলোকন করার জন্য দেশ-বিদেশের অনেক পর্যটক গমন করে থাকেন। কিন্তু বর্তমান ওই ইউনিয়নটিকে কয়েকমাসের মধ্যে পুরোপুরি হামে গ্রাস করে নিয়েছে। পুরো এলাকায় এখন মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। আর আক্রান্তের সংখ্যাও দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে।

সম্প্রতি সাজেক ইউনিয়নের বেটলিং গ্রামের সুরেশ চাকমার ছেলে নিকেতন চাকমা (১৫) হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এ নিয়ে সাজেকে হামে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৯ এবং বর্তমানে আক্রান্তের সংখ্যা রয়েছে ১৫৫জনের মতো। এলাকাটি দূর্গম হওয়ায় মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করতে সময় ক্ষেপন হয়েছে বলে জানান ইউপি সদস্য গরেন্দ্র ত্রিপুরা।

এদিকে গত কয়েকমাসে সাজেকের কয়েকটি গ্রাম হামে আক্রান্ত হলে ৮শিশু মারা যায় এবং প্রায় শতাধিকের উপর শিশু আক্রান্ত হয়েছিলো। এরপর পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলেও আবারো হাম রোগ নতুন করে ওই ইউনিয়নের ১১টি গ্রামে হানা দিলে আক্রান্ত হয় ১৫৫জন শিশু এবং নিকেতন চাকমা নামের এক কিশোর মারাও যায়।

বর্তমানে এ রোগের আক্রমণ কেড়ে নিচ্ছে শিশুদের পিতা-মাতার ঘুম। পুরো গ্রাম জুড়ে কান্নার আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন কারো না কারো শিশু আক্রান্ত হচ্ছে নতুন করে এ রোগে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, পুরো ইউনিয়নটি দূর্গম এলাকা। এখানে কখন কি হয় কেউ জানে না। হেলিকপ্টার ছাড়া যোগাযোগ করা প্রায় অসম্ভব। উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগে নেই কোন ভাল সড়ক পথ। তাই চিকিৎসা সেবা এই এলাকায় পৌছানো সত্যিই ভাগ্যর ব্যাপার। কেননা দূর্গম পথ মারিয়ে এই এলাকায় ডাক্তারদের পৌছানে দূরহ ব্যাপার। যে কারণে যথাসময়ে চিকিৎসা সেবা পৌছানো যায় না এই এলাকায়।

এছাড়া ওই এলাকার বাসিন্দারা বেশিরভাগই নিরক্ষর হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় গোঁড়ামী। যখনি ডাক্তাররা বিভিন্ন সময় কঠিন পথ মারিয়ে চিকিৎসা সেবা দিতে যায় তখনি তারা নানা কুসংস্কারে বিশ্বাস এবং ধমীয় গোঁড়ামীর ভয় দেখিয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে অপরাগতা প্রকাশ করে। যে কারণে চিকিৎসকদেরও হতাশা নিয়ে বাড়িতে ফিরতে হয়।

তবে কয়েকমাসে পুরো সাজেকে যখন হাম গ্রাস করে নিচ্ছে তখনি মাঠে নেমে পড়েছে দুর্যোগের বন্ধু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য এবং বিজিবির জোয়ানরা। তাদের সাথে যোগ দিয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসকদের একটি টিম। সকলে সমন্বয়ে হামের ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বের হতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।

যেসব শিশুরা বেশি অসুস্থ তাদের উদ্ধার করে হেলিকপ্টারযোগে উন্নত চিকিৎসা দিতে চট্টগ্রামে পাঠানো হচ্ছে। তবে ওই টিমের সদস্যদের মন্তব্য হলো- আমরা চিকিৎসার জন্য সাহায্যর হাত বাড়িয়ে দিলেও স্থানীয়রা আমাদের সাহায্য করছে না। কারণ তারা এখনো কুসংস্কার এবং ধর্মীয় গোঁড়ামীতে বিশ্বাস করে। যে কারণে সঠিক ভাবে রোগী সনাক্ত করতে আমাদের চরম বেগ পেতে হচ্ছে।

এদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সাহায্যর দোয়ার খোলা রযেছে। রয়েছে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা। আক্রান্ত শিশুদের পুষ্টিগত উন্নতির জন্য প্রতিনিয়ত উন্নত এবং পুষ্টিমানের খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। এসব কর্মকান্ড সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনার জন্য যথেষ্ট ফান্ডও দেওয়া হচ্ছে বলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

আক্রান্ত এলাকার ৭নং পাড়ার কার্বারী (গ্রাম প্রধান) দয়াল ত্রিপুরা  বলেন, গত ২দিন থেকে আমার এলাকায় মোট ১৬জন হাম রোগে আক্রান্ত হয় এবং তারা সকলই এক থেকে আট বছরের শিশু।

তিনি বলেন, আমাদের গ্রামের বাসিন্দারা সচেতন নয়। নেই কোন শিক্ষিত মানুষ। কুসংস্কারে বিশ্বাস করে গ্রামের বাসিন্দারা। যে কারণে রোগ হলে চিকিৎসা করাতে চাই না। কেউ আক্রান্ত হলে ঝাঁড়-ফু দিয়ে হলো চিকিৎসা করানো হয়। যে কারণে আমাদের শিশুদের মৃত্যুও ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। রোগটি দিনদিন ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে।

বাঘাইছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. ইফতেখার আহমেদ  জানান, সাজেকের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বের হতে আগে থেকেই আমাদের দুইটি টিম কাজ করছিলো।  প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী-বিজিবির সদস্যরা দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছে। আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি সাজেক থেকে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি দূর করতে এবং শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে।

প্রসঙ্গত: বাংলাদেশের মধ্যে আয়তনে সবচেয়ে উপজেলার নাম বাঘাইছড়ি। আর এর মধ্যে সবচেয়ে দূর্গম ইউনিয়নের নাম সাজেক। এখানে কিছু সমতল জায়গায় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠলেও প্রকৃতগত ভাবে পুরো এলাকা বেশ দূর্গম বলা চলে।

৬০৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সাজেক ইউনিয়নে ৫২হাজারের মতো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টির বসবাস। দূর্গমতার কারণে চাইলে যথা সময়ে এখনো কোন সাহায্য-সহযোগিতা পৌছানো অনেকটা অসম্ভব। তাই যেকোন সহযোগিতা পৌছাতে চাইলে এখানে ব্যবহার করতে হয় হেলিকপ্টার।