॥ আনোয়ার আল হক ॥

কি ফুটবল, কি এ্যাথলেট সব ক্ষেত্রেই এক বর্ণাঢ্য অতীত রয়েছে পার্বত্য রাঙামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলার। কিন্তু জাতীয় ক্রীড়াঙ্গনে সেই বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের মাতৃজেলা রাঙামাটির এক সময় যে সুনাম, ঐতিহ্য্য ও নামডাক ছিল; তার ছিঁটেফোটাও এখন আর অবশিষ্ট নেই। অরুন, বরুণ কিংশুক বা প্রদীপরা জাতীয় মাঠের ফুটবলে যেভাবে রাঙামাটির আলো ছড়িয়ে জেলাবাসীর মুখ উজ্জল করেছিল।

বর্তমান প্রজন্মের সামনে সে গল্প কেউ বললে তাদের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকে। এর কারণ নিকট অতীতে রাঙামাটির অতীত সুনামের সাথে সুবিচার করে আর কেউ আলো ছড়াতে পারেনি। এর পিছনে বিধাতার কোনো কারসাজি আছে কিনা তা বিধাতাই জানেন। তবে রাঙামাটির মানুষের ধারণা ক্রীড়া নেতৃত্বের দুর্বলতা, ছেলে-মেয়েদের মাঠে সক্রিয় করার ব্যর্থতা এবং সর্বপরী জেলা ক্রীড়া সংস্থার নিষ্প্রীহ ভাবই রাঙামাটির ক্রীড়াঙ্গণকে হিম শীতল করে ফেলেছে।

এমনি প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হলো জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন। নির্বাচনে এবার সিংহভাগ পদেই স্পষ্ট পরিবর্তন এসেছে। এখন প্রশ্ন উঠছে ঢাকঢোল পিটিয়ে যারা প্রায় শ’খানেক মানুষের স্বীকৃতি আদায় করে নিয়ে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন জেলা ক্রীড়াঙ্গণের প্রাণ ভ্রোমরা ডিএসএ নামক প্রতিষ্ঠানের; তারা কি জেলাবাসীর প্রত্যাশা পুরণ করতে পারবেন? আগামী চার বছর পর আবারও একই প্রশ্ন উঠবে না তো?

জেলায় নতুন খেলোয়াড় বের করে আনার জন্য যেটা সবচেয়ে বেশী জরুরী তা হলো খেলাধুলার ক্ষেত্র মসৃণ ও সক্রিয় রাখা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সেই খেলাধুলাই নিয়মিত নয় গত কয়েক বছর। রাঙামাটি ক্রীড়াঙ্গনের তথ্য বলছে, গত পাঁচবছর ধরে ১ম বিভাগ ফুটবল লীগ মাঠে গড়ায়নি।

দীর্ঘ বিরতির পর বিপুল সমারোহে নতুন করে শুরু করা ডিসি গোল্ডকাপ ফুটবল হচ্ছে না দু’বছর ধরে । জেলা পরিষদের অর্থায়নে অনুর্ধ্ব-১৪ কে পাল্টিয়ে অনুর্ধ্ব ১৬ নিয়মিত করা হয়নি। নানা জটিলতায় ১ম বিভাগ ক্রিকেট ও টি টুয়েন্টি টুর্ণামেন্টও বন্ধ হয়ে রয়েছে; তাও বছর দয়েক।

ক্রীড়াঙ্গণে চমক সৃষ্টি করে প্রথম বারের মতো মাঠে গড়ানো ‘ বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আবদুর রউফ ফুটবল টুর্নামেন্ট’, মেয়র গোল্ডকাপ, ডিএসএ ক্রিকেট টুর্ণামেন্ট একসনা ফলগাছে স্বীকৃতি পেয়েছে। একমাত্র ব্যাডমিন্টন ছাড়া ইনডোর যত খেলা আছে, তা যে ডিএসএর উদ্যোগে হয়ে থাকে তাও জানেনা রাঙামাটির নতুন প্রজন্ম।

এর পিছনে উদ্যোগ, অনীহা, পরিকল্পনা ও আন্তরিকতার নাকি সামর্থের অভাব সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ। তবে জেলা পরিষদের বাজেট প্রণয়নকালে এর জন্য বারবার চেয়ারম্যানদেরই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে দেখা যায়।

এদিকে অজ্ঞাত কারণে রাঙামাটিতে বিগত অনেক বছর কোন জাতীয় প্রতিযোগিতার ভেন্যু বসেনি। নিটল টাটা ফুটবলের পর আর কোনো খেলা না হওয়ায় এখানকার শিশু কিশোরদের মনে ক্রীড়ার প্রতি আগ্রহই নষ্ট হতে বসেছে। এমনকি গত কয়েকবছর ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বয়স ভিত্তিক টুর্ণামেন্টের (স্কুল টুর্ণামেন্ট) ভেন্যুও আসেনি রাঙামাটির কপালে।

অথচ জেলা ক্রীড়া সংস্থার বার্ষিক সাধারণ সভার তথ্য অনুযায়ী তাদের এফডিআরসহ ব্যাংকে গচ্ছিত অলস পড়ে রয়েছে রয়েছে অর্ধকোটি টাকার বেশী অর্থ। দায়িত্বরত পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী নিজেই একজন সাবেক ক্রিড়াবিদ এবং আপদমস্তক ক্রীড়ানুরাগী। জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড এবং জেলাপ্রশাসন সহ এ জেলায় সেনা কর্মসূচির মধ্যেও ক্রীড়ার বিকাশে যথেষ্ট অর্থ ব্যয়ের অতীত নজির থাকার পরও এতো দীনতা কেন, সে উত্ত খুঁজে বের করতে হবে নতুন নেতৃত্বকেই।

উপরে বর্ণিত প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এই বিশাল ব্যবধানের জন্য সদ্য বিদায়ী ডিএসএ কমিটির যদি সামান্য দুর্বলতাও থেকে থাকে তা এখন আক্ষরিক অর্থেই অতীত। নতুন নেতৃত্ব তাদের দোষ খুঁজে সময় ব্যয় করার চেয়ে এসব অপূর্ণতা দুর করতে সচেষ্ট হবে এমন প্রত্যাশাই করছে রাঙামাটির ক্রীড়ামোদীরা।

সাথে সাথে উপজেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে সক্রিয় করা এবং জেলার ক্লাবগুলোর অবকাঠামোগত ও সাংগঠনিক দুর্বলতা দুর করার পিছনেও যথেষ্ট নজর দিতে হবে নতুন কমিটিকে।

কারণ ভোটের সময় সক্রিয় হওয়া নাম সর্বস্ব ওই ক্লাবগুলোর কোন সাংগঠনিক কার্যক্রম চোখে পড়ে না কারোই। বছরের পর বছর ক্লাবগুলোর পদ পদবী দুই তিনজনে মিলে কুক্ষিগত করে রাখার অভিযোগও কম নয়। ক্লাব যদি ডিএসএ,র অধীনে থাকে তাহলে ক্লাব কার্যক্রমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গতিশীলতা আনা জরুরী। ক্রীড়া সংগঠকদের ব্যাপ্তি না ঘটলে, পরিধি না বাড়লে ক্রীড়াঙ্গনের চিন্তা-চেতনা, কার্যক্রম সংকুচিত থাকবেই।

যারা দায়িত্ব পেলেন ঃ প্রত্যক্ষ ভোটে এবছর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছেন শফিউল আজম। দোয়াত কলম মার্কায় তিনি পান ৪৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি কিংশুক চাকমা দেওয়াল ঘড়ি মার্কায় পেয়েছেন ২১ ভোট।

অপর সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী আবদুল মামুন পেয়েছেন মাত্র ৭ ভোট। গত (২৯ সেপ্টেম্বর) শনিবার রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার এ নির্বাচন পরিচালনা করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মোট ৩১ সদস্য বিশিষ্ট জেলা ক্রীড়া সংস্থার কমিটির মধ্যে ২৭ জন নির্বাচিত এবং ৪ জন পদাধিকার বলে কমিটিতে স্থান পেয়ে থাকেন।

তারা হলেন জেলা প্রশাসক একে এম মামুনুর রশিদ জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি, পুলিশ সুপার আলমগীর কবির ও এডিসি (জেনারেল) সহ-সভাপতি এবং জেলা ক্রীড়া অফিসার। সকাল ৯ টা হতে বিকাল ৩টা পর্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে ৭৩ জন কাউন্সিলর সরাসরি ভোট প্রদান করেন।

এদিকে কমিটিতে সহ সভাপতি পদে এ্যাড. মামুনুর রশিদ মামুন (৬০ ভোট), মো: আকবর হোসেন চৌধুরী (৫৬ ভোট), বরুন দেওয়ান (৪৫ ভোট), প্রীতম রায় (৩৩ ভোট) জয়ী হয়েছেন। এ পদটিতে পরাজিত হয়েছেন সুনীল কান্তি দে (৩০ ভোট), মোঃ শাহ আলম (২৬ ভোট) ও মঈন উদ্দিন সেলিম (২৩ ভোট)। অতিরিক্ত সাধারণ সম্পাদক পদে নিভানন চাকমা (৪০ ভোট) জয়ী হয়েছেন, হেরেছেন মনোজ কুমার ত্রিপুরা (৩০ ভোট)। যুগ্ম সম্পাদক পদে জিতেছেন আবদুস সবুর (৬৬ ভোট) ও মিথুল দেওয়ান (৬০ ভোট), পরাজিত প্রার্থী শেখর সেন পেয়েছেন ২৬ ভোট, কোষাধ্যক্ষ পদে মনিরুল ইসলাম (৩৭ ভোট) জিতেছেন, অপর বিজীত প্রার্থী রীজেশ বড়–য়া রমেল পেয়েছেন ৩৪ ভোট।

কার্যকরি কমিটির সদস্য পদে জয়ী হয়েছেন প্রদীপ বড়–য়া (৬৬ ভোট), মোঃ আবু তৈয়ব (৬৫ ভোট), তাপস কুমার চাকমা (৬২ ভোট), আশীষ কুমার নব (৫৭ ভোট), রনেন চাকমা (৫৬ ভোট), সাইফুল আলম রাশেদ (৫৫ ভোট), বেনু দত্ত (৫১ ভোট), আহমেদ ফজলুর রশিদ সেলিম (৫২ ভোট), নাসির উদ্দিন সোহেল (৪৯ ভোট), আহমেদ হুমায়ুন কবির (৪৬ ভোট), রমজান আলী (৪৮ ভোট), ঝিনুক ত্রিপুরা (৪৫ ভোট), জয়জিৎ খীসা (৪২ ভোট), তৌহিদুল আলম মামুন (৪১ ভোট)। জিততে পারেনি ইন্দ্রদত্ত তালুকদার, ওয়াহিদুল আলম, নুরুল মোস্তফা মিনার, ফারুক আহমদ তালুকদার বিপু ও মোঃ শাহ আলম।

উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সংরক্ষিত সদস্য পদে মোস্তফা কামাল (৪৫ ভোট), দীপেন দেওয়ান টিটু (৪৪ ভোট) নির্বাচিত হয়েছেন। এ পদটিতে পরাজিত হয়েছেন ঝিল্লোল মজুমদার, সুদর্শন বড়–য়া ও বিদর্শন বড়–য়া।

মহিলা সংরক্ষিত পদে দুইয়ের অধিক কোন প্রার্থী না থাকায় মনোয়ারা জাহান ও বীনা প্রভা বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচিত কমিটি ২০১৮-২২ মেয়াদের কমিটির দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন।