॥ স্টাফ রিপোর্টার ॥

গরীবের স্বপ্ন শুধুই স্বপ্ন থেকে যায়। দারিদ্রতার কাছে পরাজিত হয় সুন্দর জীবন। দারিদ্রতায় কেড়ে নিলো অঞ্জুলিকার জীবন। অদৃশ্য প্রাণ নিয়ে কত মানুষের নশ্বর পৃথিবীতে জন্ম।

নাবালক থেকেই চোখে দেখা আর অনুভূতির রহস্যজালে আবদ্ধ হয়ে বয়সের বৃদ্ধিতে প্রতি মানুষের স্বপ্নের শিকল গড়ে তোলার ইতি নেই।

কৈশর জীবন পেরিয়ে সংসার জীবনে পদার্পণ করলে স্বপ্নের চাহিদা বৃদ্ধি পায় প্রতি মায়ের অন্তরালে।সেই মা কেবল নিজের জীবন নিয়ে নয়,পরোপকারী হয়ে নিজ সন্তানদের জন্য আত্ম বলিদান দিয়ে স্বপ্নের রস যোগান তীলে তীলে নানান কষ্টের ভোগে।সেই স্বপ্নের রস কেউ উপভোগ করে তৃপ্তি ভরে স্বর্গবাসী হন আবার কারো ভাগ্যে তা অপূর্ণতা থেকে যায় আপসোসের জ্বালে।

ঠিক তেমনি তিন সন্তানের জননী অঞ্জুলিকা চাকমা (হিলর ভালেদী’র সদস্য মাতৃ চাকমার মা) হাজার কষ্টের সহ্য ধৈর্য্যরে বিনিময়ে স্বপ্নের অট্টলিকা চাহিদা যোগান। মাঠে কর্মে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে নিজ সন্তাদের জন্য এক পরশ সুখ অনুভূতির হাজার স্বপ্ন বুকে জমান। অন্য মানুষের মত স্বপ্ন বুনেছিলেন।

নিজের সন্তান একদিন সমাজসেবী হবেন।তিনি কত ধনী মানুষের মত বড় বড় অট্টালিকা গড়ার স্বপ্ন বুকে জায়গা দেন নি।

চেয়েছিলেন নিজ সন্তান একদিন বড় হয়ে সমাজের কর্ণধার হিসেবে কৃতিত্ব অর্জন করবে। আর সেই উজ্জ্বল্য মুখ দেখার প্রহর গুণে গুণে তার শান্তির জীবন পার হবে।

কিন্তু, অঞ্জুলিকা চাকমার বড় মেয়ে মাতৃ চাকমা এইসএসসি পড়াশুনা অবস্থায় তার(অঞ্জুলিকার) শরীরে জরায়ু ক্যান্সার আর কিডনী সমস্যা নীরবে বাসা বাঁধে।তীলে তীলে অঞ্জুলিকার স্বপ্নের বাঁধ হয়ে সামনে দাঁড়ায় মরণ ব্যাধি রোগ ক্যান্সার।

অনেক মানবতাবাদী স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠন হিলর ভালেদী ও অঙ্গ সংগঠন প্রোডাকশন’র তথা হিলর পরিবারের ডাকে সাড়া দিয়ে অঞ্জুলিকার পাশে দাঁড়ান।
অঞ্জুলিকা চাকমাকে বাঁচানোর জন্য শত শত মানবতাবাদী চেষ্টায় রয়েছেন।কেউ টাকায়, কেউ পরামর্শে কেউ বিভিন্ন সাহায্যে। তার চিকিৎসার লড়াইয়ে হিলর পরিবার ছিলো শুরু থেকেই। ভিক্ষায় মাঠে নামে স্বেচ্ছাসেবী দল হিলর পরিবারের কর্মীরা।

মানবতাবাদীদের সাড়া পেয়ে চট্টগ্রামে মেডিকেল হাসপাতাল এন্ড কলেজে চিকিৎসধীন অবস্থায় অঞ্জুলিকা চাকমার স্বামী অজয় চাকমার নিকট প্রথম পর্যায়ে হিলর পরিবার সাতাশ হাজার টাকা হস্তান্তর করে। তারপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন গ্রাম- শহরে গিয়ে টাকা উত্তোলন, বিকাশে কিংবা বাজারে সাহায্য উত্তোলন করে -২০ হাজার একশো টাকা অঞ্জুলিকার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়।

দান সহিত অঞ্জুলিকা চাকমার সাপ্তাহিকক্রিয়া, সংঘ দান অষ্ট পরিষ্কার দানে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে ২৪ শে জুলাই সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠন হিলর ভালেদী ও হিলর প্রোডাকশন’র প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি-সুপ্রিয় চাকমা ( শুভ), সাধারণ সম্পাদক -নিকেল চাকমা, অর্থ সম্পাদক-অনন্ত চাকমা,কার্যকরি কমিটির সদস্য রোমিকা চাকমা ও অঞ্জুলিকা চাকমার পক্ষে – গ্রাম কমিটির অন্যতম গুণীজন সুসারঙ্গ চাকমা,আনন্দরঞ্জন চাকমা, মাতৃ চাকমা ও তার পিতা-অজয় চাকমা সহ গ্রামের গুনীজন ব্যক্তি বর্গের উপস্থিতিতে মাতৃ চাকমার নিজ বাড়িতে ২০হাজার একশো টাকা টাকা হস্তান্তর করে সংগঠনের কর্মীরা ।

সেসময় অজয় চাকমা (অঞ্জুলিকা চাকমার স্বামী) জানান, গ্রামে পাহাড়ি বৈদ্য চিকিৎসায় থামানো যায়নি ঘাটক ক্যান্সারকে।আত্মীয় স্বজনের পরামর্শে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে আনা হলে চন্দ্রঘোনা হাসপাতালে রেফার করা হয়।

সেখানে রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে আবার চট্টগ্রাম রয়েল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। রয়েল হাসপাতালে ক্যান্সার ধরা পড়ায় আর পারিবারিক আর্থিক সমস্যার কারণে চট্টগ্রাম মেডিকেলে বেশ ১৫ দিন যাবৎ চিকিৎসাধীন ছিলেন। কিডনী সমস্যা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসলে শারিরীক ও অন্যান্য রোগের তেমন উন্নতির লক্ষণ দেখা দেয়নি।

সেই সূত্রে রোগী অঞ্জুলিকা চাকমা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে নারাজ হলে আবার গ্রামের বাড়িতে আনা হয়। দুই দিন পর হিলর ভালেদী সংগঠনের পরিবারের পরামর্শে আবার চট্টগ্রামের ক্যান্সার হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে কর্তব্যরত ডাক্তার নারাজ। অনেক মিনতি করার পর পরে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।

এমন চিকিৎসাধীন অবস্থায় অঞ্জুলিকা চাকমা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে হেরে গেলেন।ভেঙে গেলো স্বপ্ন দিয়ে গড়া অট্টলিকা। সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ঘুমিয়ে পড়লেন সারা জীবনের জন্য। রেখে গেলেন নাবালক শিশুর কাছে হাজার হাজার স্মৃতির রহস্য।স্বপ্ন পূরণের ভাড় নিজ বড় মেয়ের প্রতি দায়িত্ব অর্পিত করে স্বর্গীয় গমণ করলেন অকালে।

হিলর পরিবারের পক্ষ থেকে সুপ্রিয় চাকমা (শুভ) জানান, কর্মফল অনুযায়ী সবাইকে চলে যেতে হবে। হিলর পরিবার সর্বদাই চেষ্টা করেছে অঞ্জুলিকা চাকমাকে বাঁচাতে। নিজের ভাগ্য নিজেকে যদিও গড়ে তুলতে হয় তবুও কিছু ভাগ্য কপালের লিখনে মেনে নিতে বাধ্য হতে হয়।

শত শত মানুষের মানবতার জোয়ারে আর্থিক সাহায্যের মাঝে লুকানো ছিল সৃষ্টিকর্তার কাছে হাজার হাজার প্রার্থনা। প্রতি টাকার স্পর্শে লক্ষ লক্ষ আশীর্বাদ ছিল।অনেক মানবতাবাদী ও সমাজসেবীর প্রার্থনা ও আশীর্বাদের পরও অঞ্জুলিকা চাকমার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হলোনা। মৃত্যুর লড়াইকে হেরে ফিরতে পারলোনা আমাদের অঞ্জুলিকার বুক ভরা স্বপ্ন।